দৌড় - শাওন রোহিত || থ্রিলার গল্প

"এমন নিষ্পাপ মেয়েটাকে রেপ করে অতঃপর গলা টিপে হত্যা! মেয়েটা আমাদের আপন বোন হলে ব্যাপারটা মেনে নেবার হতো বল দোস্ত?" এডভোকেট জ...



"এমন নিষ্পাপ মেয়েটাকে রেপ করে অতঃপর গলা টিপে হত্যা! মেয়েটা আমাদের আপন বোন হলে ব্যাপারটা মেনে নেবার হতো বল দোস্ত?"

এডভোকেট জাফ্রিকে উদ্দেশ্য করে বলল পুলিশ ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"মন্দ বলিসনি। প্রথমত লাশ চুরি করার রেকর্ড আছে তারপর ধর্ষণ! নাহ, মেনে নেবার প্রশ্নই আসেনা।"

নিরাশ্বাস হয়ে বলল এডভোকেট জাফ্রি। "এদের কেইস নিয়ে তোর এগুনো ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছেনা। কেনো অযথা সময় নষ্ট করবি? ছেড়ে দে কেইসটা।"

আকুতির মতন করে বলল ইন্সপেক্টর আরিয়ান। "কেইস ছেড়ে দিয়েছি বন্ধু। তবে আশা আর হতাশার মাঝখানে ভাসমান অবস্থায় আছি। আরেকটু চেষ্টা করে দেখিনা কি হয়," বলল এডভোকেট জাফ্রি।

"তোর যা ভালো মনে হয়," ইন্সপেক্টর আরিয়ানের এই জবাবে ক্রোধের আভাস বিদ্যমান।

"আচ্ছা আজ উঠতে হবেরে। আবার সময় করে ঠিক আসবো। আর হ্যা, মাল দুটোকে দেখেশুনে রাখিস জেনো ফুঁসলে না যায়।"

চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো এডভোকেট জাফ্রি।

"কি বলছিস! মাথা ঠিক আছে তোর? কখনো শুনেছিস আমার হাত থেকে ক্রিমিনাল পালিয়েছে?" উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাস করলো ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ঠিক তা না। এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই দুজনের বয়স মাত্র ষোলো। অথচ রেকর্ডস গুলো কতটা ভয়ানক । এরা পালানোর চেষ্টা না করলেও অবিমৃশ্যতা হয়তো এদের পিছু ছাড়বে না," বা-হাতের সাহায্যে চোখ কচলানোর সাথে সাথে কথা গুলো বলল এডভোকেট জাফ্রি।

"আশাকরি তেমন কিছু হবেনা। আচ্ছা বাইরে চল,চা বিড়ি খেয়ে যা," বলল ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

জেইলের ইন্টারোগেশন রুমে পাশাপাশি চেয়ারে বাধা ষোলো বছরের দুই কিশোর। একপাশে নেলসন এবং অন্যপাশে অরিত্র। সম্পর্কে দুজন দুজনার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এতোক্ষণ পুলিশ ইন্সপেক্টর আরিয়ান এবং তার বন্ধু এডভোকেট জাফ্রির কথাগুলো চুপচাপ গিলে হজম করেছে। ইন্সপেক্টর এবং এডভোকেট রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই দুজনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ইন্সপেক্টর আরিয়ান কে এতোটাই ভয় পায় জেনো তাকে সামনে পেলেই অনুভব করে তাদের শ্বাসনালী পাথর চাপায় পরেছে। তখন শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এইতো কিছুক্ষণ আগেই পুলিশ ইন্সপেক্টর আরিয়ান একগাদা প্রশ্ন করে গেছে। সাথে ছিল এডভোকেট জাফ্রি। সব প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হয়নি। ভয়ে কি থেকে কি বলে দেয় তারপর খায় বেধড়ক পিটুনি। ইন্সপেক্টর আরিয়ানকে দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যায়। এবং বেধড়ক পিটুনি এর অন্যতম কারণ। ভয়ে এখনো অবিরত ঘাম ঝরছে। অরিত্রের চোখে সামান্য ধুলো উরে এসে পরেছে বিধায় চোখ চুলকাচ্ছে। হাত বাধা তাই চোখ কচলাতে পারছে। ক্ষোভ নিয়ে বারবার নেলসনের দিকে তাকাচ্ছে। অরিত্রের ধারণা সে একজন ক্রিমিনালে রুপান্তর হয়েছে শুধু মাত্র নেলসনের জন্য। কিন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় মুখ ফুটে বলতে পারেনা। তাই আগুন্তক দৃষ্টিতে তাকানোই তার হাতিয়ার স্বরুপ। নেলসনের মোটেও সহ্য হয়না এরুপ চাহনি। "চোখ দুটো উপড়ে ফেলবো। তখন আর এভাবে তাকাবিনা শালা," উত্তেজিত কন্ঠে বলল নেলসন।

"হ্যা তোর দ্বারা সব সম্ভব। একটা মেয়েকে প্রথমে ধর্ষণ তারপর গলা টিপে যে মেরে ফেলতে পারে তার পক্ষে অসম্ভব বলে কিছু আছে?"

"হুম ভালো করছি। এর কৈফত তোকে দিতে হবে?"

"কৈফত না। মুক্তি চাই আমি। এখানেই আমাকে পিষে মেরে ফেল। পরিবারের কাছে মুখ দেখনোর আর কোনো পথ নেই। লিতাকেও হারালাম। লিতা এতদিনে সব জেনে গেছে। আমার প্রতি তার ভালোবাসা টুকু হয়তো সৎকার করা হয়ে গেছে। আমার ফাঁসি হবার পর আমার শ্রাদ্ধের সাথে ওর ভালোবাসা টুকু শ্রাদ্ধের কাজটাও সেরে নিবে।"

"তখন খেয়াল কোথায় ছিল যখন বারবার বললাম আমার সাথে আসা দরকার নাই!আমি খারাপ তো আমার পাছে পাছে থাকার কি প্রয়োজন ছিল?"

"তখনকি আর জানতাম তুই এতো জঘন্য"

"শালা, জঘন্য তোর বাপ। চুপচাপ থাক নয়তো লাথির সাথে চেয়াল উলটে পরবি। রেপ করেছি এবং আরও হাজার-বার করবো।" অরিত্র চুপ হয়ে গেলো ।

কখনওই নেলসনের সাথে কথায় পেরে উঠেনি।নেলসন খালিরুম পেলেই অরিত্রের সাথে চেঁচাবে তবে ইন্সপেক্টর আরিয়ানের সামনে একটা শান্ত প্রাণী।

এডভোকেট জাফ্রিকে বিদায় দিয়ে ফিরে এলো ইন্সপেক্টর আরিয়ান। তারপর নেলসন এবং অরিত্রকে চালান করে দিলো সেলের ভিতর। সেই কবেই আদালত সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিতো। কিন্ত কেইসটা দুমাস যাবৎ চলছে শুধু এডভোকেট জাফ্রির কারণে। এদুজনের পক্ষ নিয়ে জাফ্রি প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে। কারণ জাফ্রির ধারণা এরা এতো বড় ক্রিমিনাল নয়। আদালত থেকে খুব আকুতি করে সময় নিচ্ছে বারবার। এদেরকে দেখলে ধারণা করা যায়না এত বড় ক্রিমিনাল । লাশ চুরির সাথে জড়িত আছে তা হয়তো ঠিক কিন্ত ধর্ষিত মেয়েটার মৃত্যুর সাথে এরা জড়িত নয়। মেডিকেল রিপোর্টে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

এই ব্যাপারটাই কেইস লড়ে যাবার প্রধান শক্তি সঞ্চার । তবে নেলসন,অরিত্র ঘটনার রাতে সেই বাড়ীতে ছিলো বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। মেয়েটার বাড়ীতে কেনো গিয়েছিল সে কারণটা সঠিক ভাবে বলতে পারেনা। একটা প্রশ্ন করলে আরেকটা বলে দেয়। সেজন্য ধর্ষিত মেয়েটার সাথে ওদের যোগসূত্র উদঘাটন করা সম্ভব হচ্ছেনা। তাছাড়া সত্যিই যদি ওরা এই কাজ করে থাকে তাহলে মিডিয়ার সামনে বিস্তারিত তুলে ধরা যাবে। এডভোকেট জাফ্রির এই কেইসটা শক্তপোক্ত ভাবে লড়বার কারণ, যদি ওরা ক্রিমিনাল হয়ে থাকে তাহলে বিস্তারিত তুলে ধরতে পারবে মিডিয়ায়। তাতে বেশ সুনাম অর্জিত হবে। এবং যদি এরা ক্রিমিনাল না হয়ে থাকে তাহলে মেয়েটার আসল খুনিকে বের করতে পারবে। অবশ্য আরো একটা ব্যাপার সেটা টাকাপয়সার হিসাব। অরিত্র এবং নেলসনের বাবা বিশাল মোটা অংকের টাকা প্রদান করবে যদি ছেলে দুটোকে নির্দোষ প্রমাণ করে দিতে পারে। ধর্ষণ পাপ না করলেও লাশ চুরির ব্যাপার আছে। লাশ পাচারকারীর সাজা খুব সহজ কিছু নয়।

ফোনে রিং বেজে উঠলো। রিসিভ করার সাথে সাথেই কান্নাভেজা স্বর শুনতে পেলো এডভোকেট জাফ্রি। লোকটা অরিত্রের বাবা। পেশায় একজন নামীদামী ডক্টর। অরিত্র তার একমাত্র সন্তান। ছেলেকে খুব ভালোবাসে সেটা তার ভাবেই প্রকাশ পায়।

"সুজন সাহেব কাঁদবেন না প্লিজ। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি," বলল এডভোকেট জাফ্রি।

"কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো?" জিজ্ঞাস করলেন ডক্টর সুজন।

"না, আশাকরি পেয়ে যাবো। আমার বন্ধু ইন্সপেক্টর আরিয়ান কে সাথে নিয়ে মৃত মেয়েটার বাড়ীতে যাবো খুব শীঘ্রই।" জবাবে এডভোকেট জাফ্রি।

"বিশ্বাস করুন আমাদের ছেলে খুনি না। ওরা এমনটা করবেনা," ডক্টর সুজন উত্তেজিত হয়ে বলল।

"দেখুন সাহেব এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারবোনা। কিছু কিছু সময় আপনজনদের অপ্রিয় সত্যটা মেনে নেয়া যায়না। এখন এমন যুগ, যে যুগে নিজ সন্তানকে পর্যন্ত ধর্ষণ করে দেয়! এটা ভাবলে স্বপ্নমঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবেন। আশাকরি বুঝাতে পেরেছি," বললেন এডভোকেট আরিয়ান।

ফোনটা কেটে দিলো অরিত্রের বাবা অর্থাৎ ডক্টর সুজন। ফোনের কন্টাক্ট লিষ্টে গিয়ে কল করা হলো নেলসনের বাবাকে। দুবার রিং হবার পরেই ওপাশ থেকে বলে উঠলো।

"হ্যালো।"

"লিংকন সাহেব আপনার ছেলের জন্য সত্যি মায়া হয়না?" উদ্বেগ কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"যা মনে চায় তাই করুন। টাকা যা লাগে বলবেন, সেটাও দেবো। যত টাকা লাগে দেবো। কিন্ত আমাকে আমার ছেলের ব্যাপারে তথ্য দিতে হবেনা। কারণ আমার ছেলে ক্রিমিনাল নয়। নেলসন আমার ছেলে। ওকে আমি চিনি ও কেমন। হয়তো নিজেকে ক্রিমিনাল বলে নিজেকে মেনে নিবে। শাস্তিভোগ করবে কিন্ত! কৈফত আমার ছেলে দিবেনা।" লিংকন সাহেব কথা গুলো বললো নিথর ভাবে।

"ছেলেকে সময় করে দেখে যাবেন। আপনারা তো ছেলের খোঁজ টা পর্যন্ত জানতে চাননা," বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"ঈশ্বর যেখানে আছেন সেখানে আমাদের গিয়ে কি হবে। আমার ছেলে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ফিরে আসবে। জেইল পর্যন্ত আমাদের যেতে হবেনা। টুট টুট.... কলটা কেটে দিলো এডভোকেট জাফ্রি। নিজেকে নিজেই জিজ্ঞাস করে... এ কেমন বিচার ! তার ছেলে দুনিয়া উলটে পালটে খাচ্ছে আর সে আছে আদর্শ বানী নিয়ে ব্যস্ত। বিত্তশালী লোকরা বুঝি এমনি হয়। টাকা ঢালবে কিন্ত খোঁজ ছেলের খোজ নিতে রাজি নয়। লোকটাকে ধরে কেলিয়ে দিলে হয়তো একটু লাইনে কথা বলতো। মাঝে মাঝে বড় সন্দেহ কাজ করে না জানি এই লোকটাও লাশ চুরির সাথে জড়িত আছে। কিন্ত পেশায় তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। নিজস্ব গাড়ীর শো-রুম আছে। নিজেদের প্রতি এতো আস্থা তবে ছেলে কেনো জেইলে আসবে?

"তোমার হয়েছে কি? বেশ কিছুদিন যাবৎ আনমনা হয়ে আছো," জিজ্ঞাস করলেন এডভোকেট জাফ্রির স্ত্রী।

"না তেমন কিছু নয়। ছেলে দুটোর কেইসটা নিয়ে ভাবছি," জবাবে এডভোকেট জাফ্রি।

"তোমরা ছেলেরা পারও বটে। সারাদিন বাহিরে গিয়ে কার কথা ভেবেছিলে?" কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞাস করলেন মিসেস জাফ্রি।

"কার কথা ভেবেছি মানে! এখন আবার শুরু হচ্ছে?" উত্তেজিত হয়ে বললেন এডভোকেট।

"সারাদিন কাজেই ব্যস্ততা। নিজের বাচ্চাটার খোঁজ নাওনা। আমার কথা না হয় বাদ," বললেন মিসেস জাফ্রি।

"জানো, ছেলে দুটোর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ভালো। যতটা খোঁজ নেয়া হচ্ছে ঠিক ততটাই অবাক করা ব্যাপার বেরুচ্ছে। আমি মেলাতে পারছিনা কিছু ব্যাপার," হতাশ হয়ে বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"কি জানি বাবা। ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে কি হবে, এখনকার ছেলেপেলে দিয়ে বিশ্বাস নেই। কি হতে কি করবে নিজেরাই বুঝেনা। রাত ২টা বেজে চলেছে,ঘুমিয়ে পরো," সাফ বলে দিলেন মিসেস জাফ্রি।

কুমিল্লা শহর থেকে কিছুটা দূরে ছেলে দুটোকে আটক করা হয়েছিল। সম্ভাবত লাশটা পাচার করে বর্ডারের দিকে নেয়া হচ্ছিল।অবশ্য ধর্ষিত মেয়েটাও কুমিল্লার বাসিন্দা। ঘটনার রাতে মেয়েটার বাসায় ছিল শুধু এই মেয়ে। তার শশুড়-শাশুড়ি ঘটনার দুদিন আগে গিয়েছে আত্মীয়ের বাসায়। তার একমাত্র দেবর ছিল বাসায়। কিন্ত ঘটনার রাতে বাড়ী ফিরেনি।সেদিন রাতে বন্ধুর বাড়ীতে ছিল। অর্থাৎ ধর্ষণকারী নিশ্চিন্তে কাজ সেরে গিয়েছিল।ঘটনার পরের দিন মেয়েটার দেবর বাড়ী ফিরে মৃত অবস্থায় পায়। কুমিল্লা পুলিশ স্টেশনে খবর দেবার পর সেখান থেকে পুলিশ বাহিনী ছুটে আসে।

আসামির খোঁজে পুলিশ টহল বের হয়। যদিও তখন সন্দেহজনক কাওকে চিহ্নিত করা হয়নি। উক্ত এলাকায় কিছু বখাটে ছেলের উৎপাত ছিল। তাদের ধরবার উদ্দেশ্য নিয়ে বের হওয়া।যদি তারা জড়িত থাকে!! কিন্ত কাওকে পাওয়া যায়নি। যাদের পেয়েছে তারা হচ্ছে নেলসন এবং তার বন্ধু ঘনিষ্ঠ বন্ধু অরিত্র। এবং লাশ সহ একটা প্রাইভেট গাড়ী। কেইসটা বিশাল তাই দুজনকে ঢাকায় চালান করে দেয়া হয়। ঢাকায় এনে সেলে ভরে যখন পিটুনি দেয়া হয় তখন দুজন স্বীকার করেছিল ঘটনার রাতে তারা দুজন সে বাড়ীতে ছিল।

কেইসটার প্যাঁচ বেধেছে এখানেই। সাধারণত লাশ পাচার করা মানুষ গুলো খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। ক্রিমিনাল ধরার রেকর্ড তুলে ধরলে দেখা যায় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড মাফিয়ার নাম উঠে এসেছে। এতো বুদ্ধিমান মাফিয়া ধরা পরলেও লাশচোর সহজে ধরা পরেনা। লাশ পাচারকারী ধরা পরার সংবাদ টেলিভিশন অথবা পত্রিকায় খুব কম দেখা যায়। কারণ লাশ চুরি হয় কিছু মাস্টার প্লান নিয়ে। এখানে দু,একজন জড়িত ভাবলে ভুল হবে। এটা বিশাল একটা টিম। যেখানে প্রত্যেক সদস্যরা হয় মাস্টার মাইন্ডের অধিকারী। নেলসন জাফ্রির সাথে লাশ এবং গাড়ী পাওয়া গেছে। অথচ লাশ গাড়ীটার কাগজ পত্র নেই। গাড়ীর মালিক কে সেটাও অজানা। গাড়ীটা কোনো নরকদূত এসে রেখে গেছে কিনা সেটা পুলিশ ইন্সপেক্টর আরিয়ানের সন্দেহের তালিকায়। সন্দেহের তালিকায় রেখেই বা কি হবে। লাশ পাচারের সময় কি আর একটা গাড়ী ব্যবহার হয়নাকি! লাশ শহর থেকে বর্ডার পর্যন্ত নিয়ে যেতে প্রায় কয়েকটা গাড়ী ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পুরোটিম মিলে কাজ করে আর সেজন্যেই ধরা পরার সম্ভাবনা খুব কম। তাছাড়া লক্ষ্য লক্ষ্য গাড়ীর মাঝে কয়টা গাড়ীর খোঁজ রাখা সম্ভব! লাশ নিয়ে তেমন খোঁজ চালাবার দরকার হয়নি। কারণ বেওয়ারিশ লাশ চুরি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সমাজের এতিম,অসহায় মানুষ গুলোর লাশ নিয়েই এমন তাণ্ডব বেশী ঘটে। এরা বেঁচে থেকেও প্রতিদিন কৃত্রিম মৃত্যুস্বাদ হাতড়ে বেড়ায়। আর মরে গেলে মাঝে মাঝে কবরে শোবার ভাগ্যটা পর্যন্ত থাকেনা। গাড়ীর ভেতরের লাশটাও ছিলো বেওয়ারিশ লাশ। কিন্ত কারা সাহায্য করে এসব বেওয়ারিশ লাশ পাচার করায় আল্লাহ মালুম। তবে মজার ব্যাপার লাশ চোররা ধর্ষণ পাপ করে সেটা এই প্রথমবারের মতন ধারণা করা হচ্ছে। লাশ নিয়েই তাদের দম আসে যায় আবার ধর্ষণ! আসলে সমাজতো ডুবে থাকে জটিলতার ঘূর্ণিপাকে, কে কিসে খোঁজ রাখে?

"হ্যা চিনছিস কোন দোকান? ওইযে বল্টুর চায়ের দোকানটা সেখানে চলে আয়," বলে কল কেটে দিলেন এডভোকেট জাফ্রি।

ইন্সপেক্টর আরিয়ানের জন্য একটা চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করছে তিনি। পত্রিকা পড়ছেন সাথে সিগারেটের অশ্বাসত টান। পত্রিকায় আজকেও নেলসন এবং অরিত্রকে বেশ কিছু লিখা দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ক্রিমিনাল নেলসন এবং অরিত্রের ব্যাপারে কম সমালোচনা হচ্ছেনা। নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যদি জেইল থেকে একবার মুক্তিপায়। তাহলে সেলিব্রিটি হয়ে যাবে সেটা নিশ্চিন্তে বলা যাচ্ছে।

"এহেম এহেম, এতো মনোযোগ সহকারে কি পড়া হচ্ছে?" জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ওহ, এসে গেছিস! বস এখানে। দেখ এদিকে আজকেও মাল দুটোকে নিয়ে পত্রিকায় কি লিখা ছাপা হয়েছে," বিদ্রুপ করে বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"ধুর! মাল মাল করিসনা। কথাটা বাজে শোনায়," কিছুটা ত্যক্ত হয়ে বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"আরে বখাটেদের ব্যাপার ছাড়। কিছু কুলাঙ্গার পোলাপান মেয়েদের নাম দিয়েছে মাল। কিন্ত মেয়েরা মাল হবে কেনো। মাল তো হয় আসলে এইসব কুলাঙ্গার এবং ক্রিমিনাল গুলো। কারণ এদেরকে মানুষের কাতারে ফেলার প্রয়োজন নেই। অবশ্য তোকে না বললেও চলবে তুই এই কথার কি বুঝবি, হাহাহ," কথা গুলো বলার সময় ঠোটে হাসি ফুটে উঠেছে এডভোকেট জাফ্রির।

"আসলেই তো! ও আচ্ছা এইজন্যই তুই সব ক্রিমিনাল কে মাল বলিস! আজ বুঝলাম," বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

এডভোকেট জাফ্রি তাকিয়ে আছে তার বন্ধুর দিকে। তার চাহনি সংকেত দিচ্ছে তিনি হেসে ফেলবেন তবে তার বন্ধুর সাড়ার অপেক্ষা পেলে। ইন্সপেক্টর আরিয়ান হাতে থাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবার বললেন, "তাইতো তোকে একটু বেশী ভালোবাসি" অতঃপর দুজনেই হেসে ফেললেন।

"আচ্ছা কাজের কথা শোন। কুমিল্লায় কবে যাচ্ছি আমরা? জিজ্ঞাস করলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"আজ এবং আগামীকাল কিছুটা ব্যস্ত আছি। আগামী পরশু যাওয়া যাক?" জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"হু চল তাহলে," বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"জানিস মেয়েটার স্বামী আমাকে কল করেছিল। তার স্বামী প্রবাসী। আসামিরা আমার কাছে জেনে আমার নাম্বার কালেক্ট করে কল দিয়েছে। বিষন্নতায় ভেঙে পরেছিলো। বারবার আকুতি করেছে জেনো এদেরকে উঠিত সাজার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।" এক নিশ্বাসে কথা গুলো বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"হুম তবে ওরা ধর্ষণ করেছে বলে মনে হয়না। ধর্ষণ তো হয়েছে সেটা মেডিকেল রিপোর্ট সাক্ষী তবে এই ছেলেরা কাজটা করেছে বলে মনে হচ্ছেনা।মেডিকেল রিপোর্ট তো তুই নিজেও ঘেটে দেখেছিস," স্ট্রেইট বলে দিলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"তুই ওদের পক্ষ নিয়ে লড়ছিস তাই এমনটা মনে ভাবিস। বারাক ওবামার চেহারা দেখে কেও আচ্ করেছিল সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে?" কপাল গুঁজে জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর জাফ্রি।

"দেখ দোস্ত, তুই যেমন দূর থেকে ক্রিমিনাল দেখলে কিছুটা বুঝতে পারিস ঠিক আমিও এদের দেখে বুঝতে পারি ক্রিমিনালদের প্রকারভেদ। আমিতো বলিনি ওরা নির্দোষ। ওরা লাশ চোর সেটা আমিও ধারণা করি। কিন্ত ধর্ষণ করেছে সেটা আমার এখনো মনে হচ্ছেনা। তাছাড়া ছেলে দুটো হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিল বাড়ী থেকে। এরা নিজ বাড়ী রেখে কোথাও নাইট প্রোগ্রাম করেনা। যত রাত হউক বাসায় ফিরে আসতো। কলেজের নিয়মিত ছাত্র। হঠাৎ এক রাতে নিখোঁজ হয়। ৩দিন নিখোঁজ তারপর ধরা পরে। এরপর একের পর এক ঘটনার আবিষ্কার," নিশ্চিন্তে কথা গুলো বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

তার কথা শুনে ভেবলার মত তাকিয়ে আছে ইন্সপেক্টর আরিয়ান। ইতস্তত করে বলে উঠলেন এডভোকেট জাফ্রি, "আর ধর্ষণ করতেও পারে। সেটার জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা আমরা করবো। আর যদি একবার প্রমাণ মেলে এরা ধর্ষণ করেনি তবে আসল খুনিকে বের করে ছাড়বো। বেশ নাম হবে তোর আর আমার।"

"আমার নাম হয়ে কি হবে বল! এডভোকেটদের নাম হলে ভালো ডিমান্ড পায়।কিন্ত পুলিশ ভালো কাজ করলে ঠোলা বলে আবার ভুল করলেও ঠোলা নামেই পরিচিত।" বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ঘুষ তো ঠিকই নেস। এবার কিন্ত আমি খারাপ হয়ে গেলাম তোর কাছে," বিদ্রুপ করে বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"ছিঃ দোস্ত এইটা বলতে পারলি। আমার মতন সৎ মানুষটাকে অমন কথাতে মানায়?"

আবেগ নিয়ে জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। এভাবেই কাজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং আড্ডায় মেতে উঠলেন দুজনে। ওদিকে সেলের ভিতর বসে গানের সুর তুলেছে অরিত্র... "এই বৃষ্টিভেজা রাতে তুমি নেই বলে, সময় আমার কাটেনা। চাঁদ কেনো আলো দেয়না।পাখি কেনো গান গায়না...."

"ভাই বিশ্বাস কর সেলের শিক ভেঙে তোর গলার ভেতর ঢুকিয়ে দিতে পারলে আমার মনে শান্তি আসতো," রাগে গড়গড় করতে করতে বলল নেলসন।

"কেন দোস্ত! আমি কি করছি?" অবাক হয়ে জানতে চাইলো বন্ধু অরিত্র।

"আমার হাড় কাঁপছে, শীতে নাজেহাল অবস্থা আর এদিকে ওনি বৃষ্টিভেজা রাতের গান গাইছে!" ব্যঙ্গ করে বলল নেলসন।

"লিতার কথা মনে পরলো দোস্ত" বলল অরিত্র।

"আচ্ছা তুই ইন্সপেক্টর আরিয়ানের সামনে সব সত্যি কেনো বলে দিস?" জানতে চাইলো নেলসন।

"আমি তোর মত ধর্ষণকারী না....খুনিও না। সত্যি বলতে আমার ভয় হবে কেনো? মেয়েটার সাথে এমন কেনো করলি নেলসন?" উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাস করলো অরিত্র।

"আমি যদি ভুল করেও একবার জেইল থেকে ছাড়া পেয়েছি তবে তোকে খেয়েছি!" দাঁতে দাঁত খিচে জবাব দেয় নেলসন।

"তারমানে তোমরা খুন করনি তাইতো?" আবারো জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"না, খুন আমরা করিনি। কে খুন করেছে সেটাও ঠিক বলতে পারছিনা," ভীত স্বরে জবাব দেয় নেলসন।

নেলসনের চেহারাটা মলিন হয়ে আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে তার কথা বলার ইচ্ছে নেই। অনিচ্ছা সত্যেও কথা বলে যাচ্ছে।

"এত এত মার খেয়ে এখনো অস্বীকার করছো! অমায়িক মানুষ তোমরা," বিরক্তিকর সুরে বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ওর ব্যাপার জানিনা স্যার। আমি খুন করিনি। ঘটনার রাতে আমরা একই সাথে বাড়ীতে প্রবেশ করেছিলাম। দোতলা বাড়ী পুরোটা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। উপর তলায় আমরা যাইনি। নিচে লুকিয়েছিলাম দুজনে। ও হঠাৎ করে বলল খিদে পেয়েছে। আমাকে রেখে চুপি চুপি গেলো। ঘরের কোথা থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসে। অন্ধকারে বসে খেয়ে চলে এলাম। তারপরের দিন কুমিল্লা থানার পুলিশ আমাদের আটক করে। জিজ্ঞাস করলে আমরা স্বীকার করলাম, আমরা গতকাল রাতে সে বাড়ীতেই ছিলাম। ব্যস! আমরা খুনি হয়ে গেলাম," মাঝে দিয়ে কথা শুরু হয় অরিত্রের। কথা গুলো বলে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অরিত্র।

কপালে ঘাম জমে আছে তার। মাঝে মাঝে দু'একফোটা ঝরে পরছে। কিন্ত ইন্সপেক্টর আরিয়ানের মেজাজ হয়তো আরো বিগড়ে গেছে। অরিত্রের কথায় তিনি সন্তুষ্ট নয়।তাই গর্জে উঠে বললেন, "ধরে থাপ্রানো উচিৎ । ইয়ার্কি হচ্ছে আর কিছুনা।"

পিটুনির কথা শুনে দুজনের শরীর শিউরে উঠে। এখনো স্পষ্ট মনে আছে। দুজনের পা বেধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পিটিয়েছিল। ৩দিনের জন্য রিমান্ডেও পাঠিয়েছিল। কি মার টাই না দিয়েছিল। রিমান্ডের শাস্তি ধরণ কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। মনে পরলেই তাদের হার্টবিট বেড়ে যায়। ইতস্তত করে আবার বলতে শুরু করে অরিত্র, "সত্যি স্যার আমি কিছু জানিনা। আমি খুন করিনি। ওর ব্যাপার জানিনা। ও হয়তো খাবার আনতে গিয়ে মেয়েটার লোভে পরেছিল। তাই রেপ করে মেরে দিয়েছে। পরে খাবার এনে আমাকে সংগে নিয়ে খেয়েছে। আমার কাছে হয়তো লুকিয়েছে বিষয়টা।"

নেলসনের চোখ কপালে উঠে গেছে। রাগে দাঁত চাপছে। তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। একেই বুঝি বলে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। বিপদে পরে এখন বন্ধুর উপর দোষ ছুড়ছে। হয়তো মনে মনে চাইছে অরিত্রকে ধরে উরাধুরা পিটাতে।কিন্ত তা কি আর সম্ভব! রাগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠে নেলসন, "তুই নিচ তলায় ছিলি! আর আমি কি দোতলায় ছিলাম? মার্ডার হয়েছে দোতলার রুমে। আমি খাবার আনতে গিয়ে এতো কিছু করে ফেলেছি নাকি তুই সেই সময়ে দোতলায় গিয়ে কুকর্ম করেছিলি।"

চোখে জল জমেছে। একবার পাপড়ি ঝাপটালেই ঝরে পরবে। অরিত্রের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। গালি দিয়েছে সেটা অরিত্র এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর আরিয়ান বুঝেছে। যদিও না বুঝবার ভান করে বসে আছে।

"স্টপ,স্টপ। কথার আগামাথা কিছু খুঁজে পাচ্ছিনা। নিচ তলা থেকে দোতলায় যেতে মেইন দড়জা পরবেনা বুঝি? কেও বুঝি টের পেতো না মেইনদড়জা থেকে কে বেরুচ্ছে?" কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। হয়তো কপাল কুঁচকে রাখার কারণ সে বুঝতে দিতে চাইছে না দুজনের কথায় তিনি বরাবরি কনফিউশনে ভুগেন। কিন্ত এখন আরো বেশি কনফিউশনে ভুগছেন। সেটা তার চোখ দুটো বলে দিচ্ছে। এতোদিন শুধু অস্বীকার করে গেছে। এখন নতুন কিছুর আবিষ্কার। দুজন দুজনকে দোষাতে ব্যস্ত। তাই কনফিউশন বাড়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার।

"না স্যার, দড়জা দিয়ে ঢুকতেই একটা লবি। লবির এক কোনে দোতলায় উঠার সিঁড়ি," জবাব দেয় নেলসন। নেলসনের কথা শুনে বিষদৃষ্টি হানলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান ।

যা ইংগিত দিয়ে বলছে "দম যত আছে দৌড়ে যাও।তোমাদের পায়ে বাধা শেকল আমার হাতে," এরুপ দৃষ্টি ভঙ্গি দেখে দুজনে একবার ঢোক গিলল। এখন আবার সেলে ভরে পিটুনি দিবে কিনা সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত। সেদিন এডভোকেট এর সামনেই তো পিটুনি দিয়েছে। ঠিক পা গুলোর রানে কিল বসায়। এমন সেন্সিটিভ জায়গাতে মারলে ব্যাথার অনুভূতি মুখে চিৎকার করেও প্রকাশ করা যায়না। জেনো দেহ ছেড়ে আত্মা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তেমন কিছু বললেন না তিনি। নিচদিকে মুখ করে মনে মনে কি জেনো ভেবে নিলেন।অতঃপর চুপচাপ ত্যাগ করলেন ইন্টারোগেশন রুম।

দুজন আনসার এসে অরিত্র এবং নেলসন কে সেলে নিয়ে গেলো। পুলিশ স্টেশন থেকে ২দিনের জন্য বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরে ইন্সপেক্টর আরিয়ান। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এর কাছে আগেই পারমিশন নিয়ে রেখেছিল। ঘটনাস্থলে যেতে হবে তাই।

বাইক স্টার্ট দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বাসায় পৌছে চম্পট গোসল দিয়ে বাথরুম ত্যাগ করে। লাঞ্চ সেরে এডভোকেট জাফ্রিকে কল দিনে বলে মনোস্তাব করে।

কিন্ত খাবার টেবিলে বসতেই এডভোকেট জাফ্রির কল চলে আসে। জলদি বের হবার তাড়া দেয় তার বন্ধু। কল কেটে খাবার শেষ করলো হুটোপুটি করে। জলদি তৈরি হতে থাকে। ট্রাভেলিং ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র গুছিয়ে নেয়। সফরে কমপক্ষে ২দিন থাকতে হবেই। তাই জামাকাপড় বাদেও টুকটাক জিনিষ পত্র বাধ্যতামূলক নিতে হবে।

গোছানোর শেষ না হতেই বাসার নিচে গাড়ীর হর্ন শুনতে পাওয়া গেল। তার বন্ধু জাফ্রি এসে পরেছে। ইন্সপেক্টর আরিয়ান তার মেয়ের রুমের দিকে ছুটে গেল। মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। ৩ বছরের মেয়ে নাম লামিয়া। বাবার একমাত্র আদুরে মেয়ে। দুষ্টামি করতে পটু কিন্ত বাবার কথা শুনে। এই ক'দিন মেয়েকে না দেখে থাকবে কি করে সেটা নিয়ে আরিয়ান বেশ চিন্তিত । গাড়ীর আরেকটা হর্ন শোনার পর আরিয়ানের স্ত্রী জিজ্ঞাস করলো, "কোথায় তুমি, সব কিছু ঠিকঠাক গোছানো হয়েছে?"

আরিয়ান মেয়ের রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইংরুমের দিকে পা বাড়ালেন। তার স্ত্রী ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। বিদায় নিয়ে বেরুচ্ছিলেন কিন্ত হঠাৎ থেমে গেলেন। রিভলভার টা সাথে নেই। ছোট করে একটু দম নিলেন। এটা তার প্রয়োজনীয় জিনিষ গুলোর একটি। কখন কোনটা কাজে লেগে যায় সেটা ধারণা করা যায়না। পেছনে ঘুরে বেড রুমের দিকে এগুলেন। রিভলভার নিয়ে ফিরে আসলেন মেইন দড়জার সামনে। অতঃপর চূড়ান্ত বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মেইন দড়জা দিয়ে। লিফট ধরে নিচে নামতে শুরু করলেন। এপার্টমেন্টের দারোয়ান দুজন লম্বা সুর টেনে সালাম দিলো। তাকে দেখলে সব সময় এভাবে সালাম দেয়। সালাম নিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলেন তিনি। গেইট দিয়ে বের হতেই তাকিয়ে দেখেন গাড়ীতে বসে আছে এডভোকেট জাফ্রি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। গাড়ীর ভেতর প্রবেশ করে ট্রাভেলিং ব্যাগটা পাশে রাখলেন। তারপর সিটবেল লাগিয়ে নিলেন। গাড়ী স্টার্ট দিলেন গাড়ী চালক ।

"লোকেশন জানা আছে তোর?" জিজ্ঞাস করলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"হ্যা বাড়ীর ঠিকানা নিয়েছি।আজকেই যাচ্ছি নাকি?" জানতে চাইলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"আরে না। আজকে যাওয়া হবেনা। কুমিল্লা শহরে এই প্রথমবার যাচ্ছি। ধর্মসাগরের নামটা শুনেছি কিন্ত দেখা হয়নি। তাছাড়া খাটি রসমালাই । উফ্! দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটবে।" এডভোকেট জাফ্রি খুব এক্সাইটেড সেটা বুঝে নিলেন তার বন্ধু আরিয়ান।

"ঠিক আছে যা ভালো মনে করিস," জানালেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। একটু চিন্তিত আছেন তিনি। মুখে না বললেও তার ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। কেমন চুপচাপ বসে আছে। অন্যান্য সময় তার বন্ধুর সাথে দেখা হলেই কতশত আলাপ জুড়ে দেয়। অথচ আজ একেবারে চুপচাপ। এডভোকেট জাফ্রি বুঝতে পেরেছেন। যদিও সরাসরি জিজ্ঞাস করেনি। এখন হয়তো অন্যান্য টপিকে কথা বলা ঠিক হবেনা। তাই ছেলে দুটোর ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলেন।

"আর বলিসনা ভাই। নতুন ন্যাকামির দেখা! একজন আরেকজন কে দোষানো শুরু করেছে। কি যে বিপদ," বিরক্তি নিয়ে বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। কথাটা শুনে বিস্ময়কর ভাবে তাকালেন এডভোকেট জাফ্রি। কি বলবে হয়তো বুঝতে পারছেনা। কেইসটা দিন দিন জটিলতায় পাকাচ্ছে সেটা হয়তো আচ্ করলেন তিনি।

"ওরা কিভাবে এই কাজে জড়িয়েছে সেটা বলেছে কখনো?" জিজ্ঞাস করলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"হু কিছুটা। তবে নিজেদের ক্রিমিনাল বলে স্বীকার করেনি কখনো।অরিত্রকে পার্সোনাল ভাবে জিজ্ঞাস করে কিছুটা ব্যাপার জেনেছিলাম," জবাবে ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"তা কি বলল শুনি," জানার আগ্রহের সাথে বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

অরিত্রের কাছ থেকে যা জানা গেছে সেটা আগে শেয়ার করেছে ইন্সপেক্টর আরিয়ান। গাড়ীতে চুপচাপ সময় কাটাতে রাজী নয় এডভোকেট জাফ্রি। তাই কথা বলানোর ফন্দি করেছে তিনি। ইন্সপেক্টর আরিয়ান বুঝেছে গেছেন, তাকে এখন কথা বলাবেই।

প্রায় ১মিনিট চুপ থেকে বলে উঠলেন "একটু অপেক্ষা কর, আমি ফোনে রেকর্ড করে রেখেছিলাম। রেকর্ডিং ফাইলটা বের করে তোকে জানাচ্ছি," ইন্সপেক্টর আরিয়ান বেশ বুদ্ধিমান লোক। ভালো একটা পথ বেছে নিয়েছেন। তাকে এখন আর মুখ নাড়াতে হবেনা। বরং ফাইলটা প্লে করে দিলে তার বন্ধুর মনোযোগ ওখানে চলে যাবে। ব্যাগ থেকে হেডফোনটা বের করে নিলো। প্লাগ ইন করে প্লে করে দিলো অরিত্রের জবানবন্দী। প্লে হলো ধারণকৃত রেকর্ডিং ফাইল প্লে হলো। অরিত্রের কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকেন এডভোকেট জাফ্রি।



"প্রতিদিন বিকেলে খেলার মাঠে আমরা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেই। সন্ধ্যা হলে যে যার মত বাসায় চলে আসি। সেদিন বিকেলে শুধু আমি আর নেলসন সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে ছিলাম। বাকি বন্ধুরা সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে যার যার মত চলে যায়। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে তখন আমি নেলসন কে জিজ্ঞাস করি বাসায় কখন যাবে। ও বলল আজ নাকি কোথায় যাওয়ার আছে। আমার কেমন জেনো সন্দেহ হলো। তাছাড়া নেলসন সেদিন আগে থেকেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে ছিল। আমি বুঝেছিলাম ওর মনে কিছু একটা চলছে। কিন্ত ব্যাপারটা কি সেটা জানার আগ্রহ বেড়ে গেলো আরো। আস্তে আস্তে সব অন্ধকার হতে শুরু হয়। ও আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাটতে শুরু করে।

যখন মাঠের গেইট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন আমি ওর পিছু নেই। হঠাৎ পকেট থেকে ফোন বের করলো। রিং এসেছিল মনে হয়। গলির এক কোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল কারও সাথে । কথা শেষ করে ফোন পকেটে রেখে আবার হাটতে শুরু করলো। আমি আবার ওর পিছু নিলাম।

কয়েক কদম হাটার পর হঠাৎ পিছনে ঘুরে তাকায়। তখন আমাদের চোখাচোখি। আমি লুকানোর চেষ্টা করিনি। বরং ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। ওর কাছে যেতেই ও জিজ্ঞাস করে আমি কেনো ওর পিছু নিয়েছি। পালটা আমি জিজ্ঞাস করলাম কোথায় যাচ্ছিস? ও বলল টপ সিক্রেট ব্যাপার । তাই বলা যাবেনা।

এটা শুনে আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। আমি জানতে চাইলাম আবারো। কিন্ত ও বলছিল না। প্রায় কয়েকবার রিকুয়েস্ট করার পর আমাকে সাথে নিবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। একটা রিক্সা ঠিক করলো। একটা হাসপাতালের নাম বলে ঠিক করে। আমি ভেবেছিলাম রোগী দেখতে যাচ্ছে। দুজন স্বাভাবিক ভাবে গল্প করছিলাম রিক্সায় বসে। কিছুক্ষণ পরে হসপিটালের সামনে গিয়ে রিক্সা থামে। আমরা নেমে ভাড়া পরিশোধ করলাম। বিশাল হসপিটালের সামনে দিয়ে ঢুকে পরলাম। ও হাসপাতালের নিচের ফ্লোরের বরাবর হাটছিল।

প্রায় তিন থেকে চার মিনিট হাটার পরে আরেকটা বিল্ডিং এর ভিতর ঢুকে পরলাম। বিল্ডিং টা সম্ভাবত এই হসপিটালেরর আরেক অংশ। আমি ওকে অনুসরণ করেই হাটছিলাম। ও আমাকে একটা জায়গায় দাড় করিয়ে বিল্ডিং এর ভেতর ঢুকে পরে। দুই মিনিট পরে আবার বেরিয়ে আসে। মনে মনে ভাবলাম রোগীর সাথে দেখা করতে আসেনি তাহলে। রোগী কে বুঝি দু'মিনিটে দেখে চলে আসবে! অন্য কাজে এসেছে হয়তো। আমাকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের অন্য রাস্তা ধরে বেরিয়ে গেলো। হাসপাতাল থেকে একটু দূরে একটা হোটেলে বসে দুজনে নাস্তা করছিলাম। নেলসন কে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল। আমি জানতে জিজ্ঞাস করি কি হয়েছে কিন্ত কিছু বলেনি। আমাকে আদেশ করে আমি জেনো নাস্তা সেরে বাসায় চলে যাই। আমি বললাম ওর সাথে ফিরবো যেহেতু একই এলাকায় থাকি আমরা। কিন্ত ও বলল এখনি যাবেনা। ওর দেরি হবে। আমি ওর সাথে ফিরবো জানালাম। তখন আমাকে বলে, অনেক রাত হবে বাসায় ফিরতে। আমার কাছে কেমন জেনো সন্দেহ হচ্ছিলো । ও তো এত রাত করে বাড়ী ফিরেনা। তাছাড়া আংকেল খুব রাগী মানুষ। ও এটা জেনেও এমন বলছে! তাহলে সত্যিই সিক্রেট একটা কাজ আছে ওর। আমার কিছুটা রাগ হয়। আমার কাছে কেনো লুকোচ্ছে সেটা। আমার কাছে তো কোনো কিছু লুকায়না।

তাহলে আজ এমন করছে কেনো! নাস্তা সেরে বেরিয়ে পরলাম। আমাকে বলল রিক্সা নিয়ে চলে যেতে কিন্ত আমি চুপচাপ থাকলাম। রাগ তখন আমার অভিব্যক্তি। ও আর কিছু বলেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আমিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার রাগ ছিল এই, আমাকে কেনো বলছেনা!

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাকে সাথে নিয়ে যাবে বলে জানায়। আমি তখন খুশি হয়ে যাই। তারপর আমাকে সাথে নিয়ে কিছু সময় রাস্তায় কাটিয়ে দেয়।

ঘড়িতে যখন ৯টা বাজে তখন আমাকে নিয়ে আবার সেই পেছনের বিল্ডিং টার দিকে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় অনেক মানুষ দেখেছিলাম কিন্ত তখন একদম ফাঁকা। একটা এম্বুলেন্স আছে কিন্ত মানুষ নেই। আমাকে এক সাইডে রেখে নেলসন এগিয়ে যায় বিল্ডিং এর ভেতর। কয়েক সেকেন্ড বাদেই ফিরে আসে। এম্বুলেন্সটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমাকে হাতে ইশারা করলে আমি ওদিকে যাই। দড়জা আনলক ছিল। তাই সহজেই আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পরলো। আমি কিছু বুঝবার আগেই আমাকে হাতে ইশারা দেয় চুপ থাকার জন্য। ভয় পাচ্ছিলাম কারণ এম্বুলেন্সের ভেতরে একটা লাশের বাক্স।

আমি জিজ্ঞাস করলাম, "এখানে ঢুকলি কেনো?" কিন্ত জবাব নেই।

ও যত্নসহকারে করে বাক্সের উপরের পার্ট উঁচু করে। একহাতে ফোনের ফ্লাশ অন করে। অন্য একটা হাত বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। কি জেনো দেখলো। তারপর বলল ঠিক আছে। আমি তাকাইনি।

অপরিচিত লাশ ভয় পাই তাছাড়া সেখানে আমরা মাত্র দুজন। তখন মনে হয়েছে নেলসনের পরিচিত কেও মারা গেছে। এটা তার ডেড বডি। মনে মনে ভাবছিলাম হয়তো বাকিরাও এসে যাবে। লাশ নিতে নেলসন একা আসবে? কোনো প্রশ্নই আসেনা। কিন্ত ভাবনাটা ভুল তখন বুঝলাম। কিছুক্ষণ পর যখন বাহির থেকে দড়জাটা লক করে দিলো। গাড়ী স্টার্ট দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ড্রাইভ করছিলেন। এম্বুলেন্সের জানালা নেই। দম আটকে যাচ্ছিলো। গাড়ী কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। দেখাও সম্ভব হচ্ছিলো না।

নেলসন কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে শুরু করে। খুব শীত লাগছিলো কারণ জ্যাকেট নেই। নেলসনের জ্যাকেট নেই কিন্ত মনে হচ্ছিলোনা ওর শীত লাগছেনা।

নিরুপায় আমি অনলাইনে চ্যাটিং নিয়ে ব্যস্ত হবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্ত মনোযোগ বসাতে পারিনি। বিভিন্ন টেনশন হচ্ছিলো । কার লাশ,কেমন লাশ সেটাও জানিনা।অথচ দুজনে যাচ্ছি এর সাথে। নেলসনও চুপচাপ গান শুনছে।

মনে মনে সান্তনা দিচ্ছিলাম নিজেকে। আর যাই হউক নেলসন ভুল কিছু করছেনা। আমার এতো দিনের বন্ধু ভুল কিছু করবেনা সেটা আমার আত্মবিশ্বাস। অন্তত কোনো বিপদে ফেলবেনা আমি জানি। তবুও কিছু প্রশ্ন খেলছিলো মাথায়। যেটা আজও জানতে পারিনি ওর কাছ থেকে।

গাড়ীটার গতি কমে যায় হঠাৎ করে। বাহিরে অন্যান্য গাড়ীর হর্নের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। হয়তো জ্যামে পরেছে গাড়ীটা। কিছুক্ষণ থেমে থাকে আবার চলে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ সময় চলে যায়। তারপর আবার স্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকে গাড়ী । হয়তো এখন আর জ্যাম নেই । এই টানে প্রায় দেড় ঘন্টা পর গাড়ীটা থামলো।

ড্রাইভার গাড়ী থেকে নেমে গেলেন। দড়জার লক খোলার স্পষ্ট শব্দ পেলাম। নেলসনকে তখন খুব ভিতু দেখাচ্ছিলো। ওকে নার্ভাস দেখে আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। ভুল কিছু হতে যাচ্ছে সেটা বুঝলাম। দড়জা খুলতে দুজনেই করলাম চিৎকার । ড্রাইভার দড়জা ছেড়ে দৌড় দিলেন প্রথমে। আমরা তখনও গাড়ীর ভেতরে। আমি নেলসন কে জিজ্ঞাস করলাম, "কিরে এগুলা কি হচ্ছে?" ও তখন থরথর করে কাঁপছে।

পাঁচ মিনিট পরে আবারো দরজাটা তুললেন ড্রাইভার। টর্চের ডিপ আলো চোখে এসে পরে। আমি তাকাতে পারছিলাম না। একটা ঝাঁঝালো কন্ঠ জিজ্ঞাস করে, "তোমরা কে?" গাড়ী থেকে আমরা ধীরে ধীরে বের হলাম। একদম অন্ধকার একটা জায়গা। আশেপাশে কিছু নেই। জংগলের মত দেখতে। শুধু ঝি ঝি পোকার শব্দ।

আমার তখন দমবের হবার অবস্থা। প্রচণ্ড শীতেও কাঁপছিলাম। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। নেলসন নিজেকে সামলে নিয়েছিলো। ওকে তখন আর নার্ভাস দেখাচ্ছিলোনা। নেলসন স্বাভাবিক সুরে বলে, "আপনি এখানে?"

ড্রাইভার তখন কিছুটা অবাক হয়। "হ্যা আমি থাকবোনা তো কে থাকবে। লাশটা আমি ডেলিভারি দিতে যাচ্ছি," জানালেন তিনি। নেলসন সাথে সাথে বলে, "ওহ্ তাহলে আমরা ভুল গাড়ীতে উঠে চলে এসেছি। ডেলিভারি দিয়ে আবার হাসপাতালে ফিরবেন যখন, তখন আমাদের কে ওখানে নামিয়ে দিয়েন।"

ড্রাইভার খুব রেগে যায় তখন। আমাদের কে ওনার সাথে নিবেন না। এখান থেকেই কেটে পরতে বললেন। নেলসন একটু ভাব ধরে বলে, "তাহলে আমাদের আনলেন কেনো? আমরা কি ইচ্ছা করে আসছি এখানে?" কথা শুনে ড্রাইভার এমন ভাবে তাকালেন যা ইংগিত করছিলো আমাদের কে গিলে খেয়ে ফেলবেন। নেলসন আবার বলে, "এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। আমরা ভুলবশত এই গাড়ীতে উঠেছি। এই গাড়ীতে যাবার কথা ছিলোনা আমাদের। এত রাতে এখন কিভাবে ফিরবো। জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছে জংগল। রাস্তাও তো নেই।"

কিন্ত ড্রাইভার সাথে নিবে না, বলে দিলো আবার। অতঃপর তাদের মাঝে তর্ক বেধে যায়। তর্কের এক পর্যায়ে একটা চিৎকার ভেসে আসলো। মনে হয়েছিলো ভূত-প্রেতাত্মার করা চিৎকার। হরর মুভিতে যেভাবে চিৎকার করে ঠিক তেমন শুনতে। ড্রাইভার তখন তর্ক বাদ দিয়ে আমাদের কে সাহায্য করার অনুরোধ করলেন। লাশের বাক্সটা ধরতে বললেন। আমরা তাকে সাহায্য করি। কোনমতে বাক্সটা বের করে অন্য একটা এম্বুলেন্স এ ঢুকালেন। এম্বুলেন্স বললে ভুল হবে। সেটা মাইক্রোবাস ছিল সেটা। পেছনের দড়জা লক করে দিলেন।

আমাদের কে সামনে বসালেন তাড়াহুড়ো করে। গাড়ী স্টার্ট দিয়েই একটা টান। আমি কিছু বুঝলাম না। প্রথমে গিয়েছিলাম এক গাড়ীতে কিন্ত এখন আবার আরেকটা গাড়ী। নেলসনও চুপচাপ বসে আছে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম তখন রাত ১টা বাজছে।

নেলসন স্বাভাবিক ভাবে বসে ছিল। কিন্ত আমি বুঝে গিয়েছি ও ইচ্ছে করে এই গাড়ীতে উঠেছে। ড্রাইভারকে মিথ্যা বলেছে। "একটু পানি হবে?"

"হুম হবেতো। আমার ব্যাগে দেখ,একটা পানি ভরা বোতল আছে," জবাব দিলেন এডভোকেট জাফ্রি। জাফ্রির জবাব পেয়ে খিলখিল হেসে ফেললেন তার বন্ধু আরিয়ান। রেকর্ডিং পুস রাখলেন।

"আরে পানি রেকর্ডিং এ চাইছে । তুই মনে করছিস আমি চাইছি?" বিদ্রুপ করে বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। চোখ মেললেন এডভোকেট জাফ্রি। বা-পাশের ভ্রু উঁচু করে দৃষ্টি হানলেন তার বন্ধুর দিকে।

"যাই হউক গলাটা শুকিয়ে গেছে। একটু পানি দরকার এখন," ইন্সপেক্টর আরিয়ান তার বন্ধুর ব্যাগ থেকে বোতল নিয়ে খুলছিলেন আর বলছিলেন।

"আসলেই তো! সত্যি বলতে খুব এঞ্জয় করছিলাম দোস্ত। এটা মোটেই জবানবন্দী লাগছিলো না। মনে হচ্ছিলো রুপ কথার গল্প। এই হইছে, সেই হইছে, মাঝ খান থেকে জুতো হারায় গেলো। আমিও গল্পের একটা ক্যারেক্টার হয়ে গেলাম আর জুতো খুঁজতে শুরু করলাম,"এডভোকেট জাফ্রির কথা শুনে ঢোক গিলতে সক্ষম হয়নি তার বন্ধু। বোতল খুলে মুখে পানি তুলে নিয়েছিলেন। তবে ঢোক গিলার বেগ থেকে তার হাসির বেরুবার বেগ প্রেশার ছিল দ্বিগুণ। তাই যা হবার তাই হলো।

"ধুর বেটা, দিলিতো ভিজিয়ে! এগুলো কেমন ফাইজলামি," রেগে গেলেন এডভোকেট জাফ্রি। তার শরীর ভিজে গেছে ইন্সপেক্টর আরিয়ানের মুখের বিশ্রী পানিতে। কিন্ত তখনও হাসছেন তার বন্ধু।

"নে জলদি খেয়ে রাখ। রেকর্ডিংটা শুনতে দে," আদেশ দিলেন এর ভো কেট জাফ্রি।

"আচ্ছা একটা ব্যাপার আমাকে বারবার অবাক করে। অরিত্র চিৎকারের যে কথা বলেছে সেটা আসলে কি হতে পারে?" প্রশ্ন করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ওটা শেয়ালের ডাক। এছাড়া আর কি হবে।" উত্তর দিলেন এডভোকেট জাফ্রি। কিন্ত ইন্সপেক্টর আরিয়ান হয়তো এ উত্তরে সন্তুষ্ট নয়। কিছু একটা ভাবছিলেন।

"শোন, শেয়াল খুব চালাক। কয়েক রকম ভাবে ডাকতে পারে। ওরা মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য অন্যস্বর নিয়ে ডাকে। ওখানে লাশের ঘ্রাণ পেয়ে ছুটে এসেছিল। দূর থেকে মানুষ দেখতে পেয়ে ভয়ানক চিৎকার করে জেনো মানুষ ঘাবড়ে গিয়ে পালিয়ে যায়। দ্বিধা দূর করবার জন্য বিস্তারিত বললেন এডভোকেট জাফ্রি। "শেয়াল! বলিস কি, আমিতো ভেবেছিলাম অস্বাভাবিক কিছু হবে।"

বিস্ময়কর চাহনি দিয়ে বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান, "আরে নাহ। তেমন কিছুনা। আচ্ছা এবার প্লে কর প্লিজ ভাই। বাকিটা শুনে নেই। বললেন এডভোকেট জাফ্রি। তার অনুরোধমত প্লে করে দিলেন রেকর্ডিং ফাইল।"

গাড়ীটা চলতে থাকে হাইওয়ে রাস্তা ধরে। রাস্তাটা কোন দিকের সেটা বুঝতে পারিনি। রাত গভির তাই কুয়াশার ঘনত্ব বাড়ছে। গাড়ীর গতি কমছিল কুয়াশাকে নির্ভর করে। কিছুপথ এগিয়ে যাবার পর ড্রাইভার বললেন, "আমাদের কে কুমিল্লা বিশ্বরোড পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। সেখানে পৌছালে আমরা জেনো নেমে পরি।" এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ আমি তখন নেলসনের উপর নির্ভরশীল। ও যেদিকে যায় আমারো সেদিকে যেতে হবে। তাছাড়া বাসায় জানানোর মতন সাহস ছিল না।

অনেক আগেই ফোনের সুইচ অফ করে আমি চুপচাপ । অবশ্য নেলসনও কিছু বলেনি। ও কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে ছিল। কিছু একটা ভাবছিল যেটা ও ভালো জানে। সবাই নীরবতা পালন করছিলাম।

গাড়ীটা একটা গ্যাস রিফিলিং স্টেশনে গিয়ে থামলো। প্রথমে আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে নেই। তারপর গ্যাস নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। ড্রাইভার সিগারেট ফুঁকছিল আর বলছিল, "আমাদের সাথে পেয়ে তার জন্য ভালোই হয়েছে। রাতে লাশবহন করা গাড়ীতে নাকি সমস্যা হয়। লাশ নিয়ে একাবের হওয়া ঠিকনা।"

কথাগুলো গল্পের মত মনে হয়েছে আমার কাছে। নেলসন অবশ্য এ ব্যাপারে তার সাথে কিছুটা তাল মিলিয়ে ছিল। তারা দুজনে কিছুটা গল্প শুরু করে। তখন আমার খুব ঘুম ধরে। খাবারের পর থেকে আরো শীত লাগছিল। ওদের কথায় তেমন মনোযোগ দিতে পারিনি বিধায় ঘুমিয়ে পরেছিলাম।

একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখি অন্ধকার এক রাস্তায় পরে আছি। দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্ত পায়ে অনেকটা আঘাত লেগেছিল। দাঁড়ানোর মতো শক্তি ছিলনা। শীতে হালকা আঘাতটাও বিশাল আকার ধারণ করে।এটা ছিল তার আরেকটা উদাহরণ। উঠে দাঁড়াতে পারিনি। ওখানে বসেই চোখবন্ধ রেখে ঝিমানো শুরু করি। প্রায় ২ মিনিট পর নেলসন এসে আমাকে ডাকে। ঘুমের নেশা তখনও কাটেনি। হু হু করে সারা দিচ্ছিলাম নেলসনকে। আমাকে জিজ্ঞাস করে গাড়ীটা কোথায় গেছে। আমি কিছু বলতে পারিনি।

আমার শুধু মনে আছে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হইছে।কিন্ত কে দিয়েছে, কোথা থেকে দিয়েছে সেটা তখনও আমার অজানা। আমাকে টেনে দাড় করায় নেলসন। ওর কাঁধেভর করে ওর সাথে চলতে থাকলাম।

তখনও অন্ধকার রাত। আমাকে একটা জায়গাতে নিয়ে শুইয়ে দেয়। পাশে বসে নেলসন। ফ্লোরটা খুব ঠাণ্ডা ছিল। নেলসন পাশেই বসা, আমি ওর আসন করা পায়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে যাই। সকালে নেলসনের ডাকে ঘুম ভাঙে। উঠে বুঝতে পারলাম রাতে একটা মসজিদের বারান্দায় শুয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। উঠে ফ্রেশ হলাম পাশে থাকা একটা পুকুর থেকে। তারপর দুজনে একটা হোটেলে গিয়ে সকালের নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে বিল দিয়ে বের হলাম দুজনে। চারদিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম এটা একটা গ্রামের বাজার। কিন্ত এই জায়গাতে আমরা প্রথম এসেছি। দুজনে হাটতে শুরু করি একটা পথ ধরে।

আসলে আমি নেলসনকে তখনও অনুসরণ করছিলাম। পায়ের ব্যাথা তখন অনেকটা কমে গেছে। একটা গাছের নিচে বসলাম দুজনে। নেলসন আমাকে তখন শেয়ার করে রাতের ঘটনা। কুমিল্লা বিশ্বরোডে আমাদের কে নামতে বলা হয়। কিন্ত তখন আমি ঘুম। নেলসন আবদার করে আমাদের কে আরেকটু সামনে নামিয়ে দেবার। তখন ড্রাইভার আমাদের কে নিয়েই তার গন্তব্যে চলে যেতে থাকে। নেলসনের তখন ঘুম ধরে।এই বাজারে গাড়ী আসার পর নেলসন গাড়ী থামাতে বলে। গাড়ী থামালে ও যখন হাতমুখ ধুতে বের হয় তখন আমাকে গাড়ী থেকে ধাক্কা দেয়।আমি পরে গেলে, গাড়ীটা নিয়ে চলে যায়।

ঘটনাটা শোনার পর রাতের ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। সে ব্যাপারে জানার আর আগ্রহ দেখাইনি। আমি জিজ্ঞাস করি, "বাসায় কখন ফিরবে।" ও বলল, "আজকেই ফিরবে তবে গাড়ীটা কোথায় গেছে সেটা একটু খুঁজবে।" আমি তখনও ওর হাব-ভাব নিয়ে কনফিউজ। অনেক রাগ হয়েছিল কিন্ত কিছু বলতে পারিনি। বাজারে ফিরে আসলাম দুজনে। আমি ব্যাথার ঔষধ খেয়ে নিলাম। নেলসন একটা অটো গাড়ীর ড্রাইভারকে জিজ্ঞাস করে এই পাঁকা রাস্তাটা কোথায় গেছে? "রাস্তাটার শেষ অন্য একটা গ্রামের বাজারে গিয়ে। তারপর কিছুটা জংগলের মত। জংগলের ভেতর দিয়ে দালাল ধরে নাকি ইন্ডিয়া চলে যাওয়া যায়," জানালেন তিনি।

নেলসন অটোকে সেদিকে নিয়ে যেতে বলে। আমাদের কে সেদিকে নিয়ে যায়। সেই বাজারে গিয়ে আমাদের কে নামিয়ে দিল অটো চালক। আমরা প্রথমে আশেপাশে গাড়ীটার খোঁজ করি। কিন্ত পাইনি, তারপর জংগলের রাস্তা ধরে এগুতে থাকি। কিছুদূর যাবার পরে কিছুই পাইনি। নেলসন সিদ্ধান্ত নেয় ফিরে আসবার জন্য কিন্ত তখনি একটা কাণ্ড। আমাদের কে কয়েকটা ছেলে ঘেরাও করে। প্রথমে হালকা মারধর করে।তারপর মানিব্যাগ, ফোন নিয়ে ছেড়ে দেয়। আমরা সেখান থেকে চলে আসি সেই বাজারে। ওখানে দিনের বাকি সময় কাটিয়ে দেই। টাকা না থাকায় লাঞ্চ করতে পারিনি সেদিন দুপুরে। সন্ধ্যা হবার কিছুক্ষণ বাদে বাজারটা জনশূন্য হতে থাকে। আমি নেলসন কে তখন রিকুয়েস্ট করি বাসায় জানানোর জন্য কিন্ত ও আমার কথা শোনেনি।

কিছু সময় বাজারে বসে কাটিয়ে হাটতে শুরু করে নেলসন। আমিও ওর পিছু নেই। বাজার থেকে প্রায় ১ কিঃমিঃ পথ ভেতরে চলে আসি। কিন্ত এটা জঙ্গলের পথ না। এটা আরেকটা পথ। যেখানে বাড়ীঘর দেখা যাচ্ছিলো রাস্তা থেকে। রাস্তার পাশে খেয়াল করলাম খেজুর গাছে হাঁড়ি ঝুলছে।

নেলসন গাছে উঠে। প্রথমে কয়েকবার চেষ্টা করে একটা গাছে । সেটা থেকে পরে যায়। তাই ছোট একটা গাছ খুঁজে নেই দুজনে। হাঁড়ি নামানোর পর দুজনে রস খেয়ে নিলাম। খুব খিদে ছিল। তবে হাঁড়িতে রস তেমন ছিলনা। বিকেল অথবা সন্ধ্যার সময় হাঁড়ি ঝুলিয়েছিল তাই হয়তো রস ছিল খুব কম।

"আমার মেয়েটার জন্য রস পাওয়া যাবে এখন?" রেকর্ডিং অফ করে জিজ্ঞাস করেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"শীতের প্রায় শেষ সময় এখন। কপাল ভালো হলে পাবি।"

"হঠাৎ রসের ব্যাপার আসলো কেনো?" ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাস করলেন এডভোকেট জাফ্রি?

"না তেমন কিছুনা। ভাবছি মেয়েটার জন্য নিয়ে যাব তাই," জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

জবাবটা ঠিক বলে মেনে নেয়নি এডভোকেট আরিয়ান। তার কাছে ব্যাপারটা ভালো ঠেকেনি। তাই ধমকের সুরে বললেন " তোর মাথা গেছে? ওটুকু বাচ্চাকে রস খাওয়াবি! যদি সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে তো বড় মানুষরাও হজম করতে পারেনা।" কথাটা হয়তো খারাপ লাগেনি। তাই ইন্সপেক্টর এর বিপরীতে আর কোনো জবাব ছাড়েননি। বরং বন্ধু তাড়া দেবার আগেই রেকর্ডিং ফাইলটা প্লে করে দিলেন.....

"রস খেয়ে পেট ভরেনি আমার। মনে হচ্ছিলো আরো খিদে বাড়ছে। সেই দুপুর থেকে না খেয়ে আছি দুজন। টাকাতো গেছে সেই জংগল থেকে ফেরার পথেই। নেলসন চুপচাপ হাটছে।আমি ওর পিছে পিছে। কুয়াশা ঘন হচ্ছিলো ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে বাতাস এসে শরীর শিউরে দেয়। সোয়েটার, জ্যাকেট কিছুই ছিলনা। অমন ঠান্ডাতেই হেটে চলছিলাম। কিন্ত এক সময় আমার পা থেমে যায়। ঠান্ডায় শক্ত হয়ে গিয়েছিল পায়ের পাতা। প্রতি কদমে কেমন জেনো ব্যথা লাগছিল। আমি মাটিতে বসে পরলাম। নেলসন কে ডাকার পর ও তিন-চার কদম পিছিয়ে এসে আমাকে ধরে। আমাকে ধরে খানিকটা ঘাব্রে উঠে। কারণ শরীরে হালকা কাঁপুনি শুরু হয়েছে। আমাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে কিন্ত আমি উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। একদিকে খালি পেট অন্যদিকে প্রচণ্ড শীত। দুটো মিলে আমাকে অনেক বেশী দূর্বল করে দিয়েছিল।

আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘর বাড়ী নেই। ওখান থেকে কিছুটা দূরে একটা বিল্ডিং। ওখানে ওই একটা বিল্ডিং এর আলো দেখা যাচ্ছে শুধু। দূর থেকেই বুঝেছিলাম আমরা বিল্ডিং টার পাশে হয়তো আর বাড়ী নেই। দুজনে সিদ্ধান্ত নিলাম ওখানে গিয়ে আমাদের সমস্যার কথা বলে আজ রাতের জন্য আশ্রয় চাইবো।

কিন্ত ওখানে পৌছানোর পর অন্য ঘটনা দেখি।বাড়ীর মেইন গেইট তালাবদ্ধ। বাড়ীটার চারপাশ ইটের দেয়ালে ঘেরা। দেয়াল টপকে ওপরে যাওয়া ঠিক হবেনা। তাই ওখান থেকে হাটতে শুরু করেছিলাম। বাড়ীর সীমানা পার হতেই একটা শব্দ হয়। রাইফেলের এমটি ফায়ারের মত। খুব ভয় পেয়ে যাই দুজনে। জলদি হেটে আসছিলাম ঠিক তখন পেছন থেকে একটা এনাউন্সের শব্দ শুনতে পেলাম। দুজনে পিছনে ফিরলাম। কোনদিক থেকে আসছে সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিলো না। প্রথমে অস্পষ্ট ছিল তবে দু-তিনবার বলার পরে বুঝতে পারি। "প্রিয় গ্রামবাসী, গ্রামে ডাকাত ঢুকেছে। সবাই সাবধানে থাকুন। পরবর্তী এনাউন্স না দেয়ার আগে কেও ঘুমাবেন না। ডাকাত দেখা মাত্রই হুইসেল বাজাবেন," কথা গুলো শুনে কিছুটা ভয় লেগে যায়। ডাকাতদের সাথে নাকি অস্ত্র থাকে। রেগে গেলে মানুষও মেরে ফেলে। কথা গুলো শোনা কথা। তবে মনে পরতেই দ্রুত হাটতে শুরু করি আমি। তখন ব্যাথা কে প্রাধান্য দেইনি। কথায় আছে জান বাঁচানো ফরজ। প্রায় চার মিনিট হাটার পর আরেকটা বাড়ীর দেখা পেলাম। পাকা রাস্তার সাথেই বাড়ীটা। আরো বেশ কয়েকটা বাড়ী দেখেছিলাম তবে দূরে। পাকা রাস্তা বেয়ে গেছে মাটির কিছু রাস্তা। সেদিকটায় যেতে ইচ্ছুক না আমরা তাই পাকা রাস্তা ধরেই হাটছিলাম। সামনের বাড়ীটা ছিল দোতলা।বাড়ীটার মেইন গেইট খোলা ছিল। তাই সহজেই প্রবেশ করি দুজনে।

এই বাড়ীটার উঠানের একপাশে ছোট একটা ফুলের বাগান । অন্যপাশে ২টা পেয়ারা গাছ লাগানো আছে। একটু এগিয়ে গেলাম আমরা। বাড়ীতে প্রবেশ করার দড়জাটা খোলা ছিল। আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেও আছে কিনা। কারও সাড়া পাইনি। দূর থেকে সুইচবোর্ডের পালস্ লাইট দেখা যাচ্ছিলো। নেলসন ওটাকে টার্গেট করে এগিয়ে যায়। অতঃপর লবিতে থাকা লাইটগুলোর মধ্যে একটি জ্বালিয়ে দেয়। ঠিক তখন বুঝতে পারলাম সেটা একটা লবি। দেয়ালের একপাশে সোফায় বসে পরলাম আমি। অনেক সময় ধরে হেটেছি। একটু বিশ্রাম নেবার জন্য চুপচাপ বসে রইলাম। লবির আশেপাশে আরো কয়েকটা রুম ছিল। লবির এককোনে দোতলায় উঠার সিঁড়ি। নেলসন হঠাৎ বলল তার খুব খিদে পেয়েছে। আমাকে বসিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। কোথা থেকে খাবার এনে আমাকে সাথে নিয়ে খেলো। তারপর দুজনে বসে রইলাম সোফায়। শীতে কাঁপছিলাম তখনও। নেলসন অন্য রুমে গিয়ে একটা জ্যাকেট হাতে করে ফিরে আসে । কার জ্যাকেট জানিনা আমরা। আমাকে পরতে বললে পরে ফেলি। তখন এতো ভাবার সময় পাইনি। প্রচণ্ড ঠান্ডায় হয়তো মাথা কাজ করছিলোনা।খাবার খেয়ে কিছুটা ঘুম চলে এসেছিল। আমি সোফায় কাত হয়ে শুয়ে পরি। তারপর কি হয়েছে আমি জানিনা। নেলসনের ডাকে ঘুম ভাঙে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বলতে পারবোনা। তারপর বাসা থেকে বেরিয়ে পরি দুজনে। রাস্তাধরে এগিয়ে যেতে থাকি দুজনে। আধ ঘন্টা হাটার পর ভোরের আলো ফুটে উঠছিলো। কিছু সময় পরে আজান শুনতে পাই। একটা বাজারে গিয়ে থেমে পরলাম দুজনে। আসলে বাজার বলা যায়না। ওখানে সাত-আটটা দোকান হবে। ওখানে একটা মসজিদও আছে। মসজিদে গিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম দুজনে। ঘুম থেকে উঠেছিলাম দুপুরের দিকে। জোহরের আজান হচ্ছিলো তখন ঘুম ভাঙে। দুজনে উঠে গিয়ে বের হলাম মসজিদ ছেড়ে। একটা টিউব ওয়েল থেকে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলাম।

ওখানের একটা চায়ের দোকানে বসলাম । বসে বসে টেলিভিশন দেখছিলাম। বেশ সময় কাটছিল কিন্ত নেলসন আমার মাথা কাত করে রাস্তামূখী করে দেয়। দেখতে পেলাম সাদা একটা মাইক্রোবাস। চিনতেও পেরেছি সেটা। এইটা সেই মাইক্রোবাস টা যেটা ধরে আমাদের এখানে আসা। তবে গাড়ী দুটো চেঞ্জ হয়েছিলো। এটা পরের গাড়ীটা। গাড়ীটে ভিতরের দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ শহরের পথ থেকে এসে এখন আরও ভিতরে যাচ্ছে। আমি উঠে এক দৌড় দিলাম গাড়ীর পিছু ধরে। সাথে চিৎকার করলাম.... "দৌড় নেলসন, দৌড়," নেলসনের আগে আমি দৌড় শুরু করার কারণ এই গাড়ীটার জন্য এতো কষ্ট করছিলাম। গাড়ীটা খুঁজে পেলেই নেলসন বাসায় ফিরবে। আর আমি ছিলাম বাসায় ফেরার অধীর অপেক্ষায়। তাই ওর আগে আমি নিজেই দৌড় শুরু করলাম। গাড়ীটা কম স্পিডে চলছিলো। রাস্তা পাকা হলেও জোরে চলার কারণ নেই। রাস্তা খুব ভাঙা তাই আমরা গাড়ীটার পিছু নিতে পেরেছিলাম। একটানা প্রায় ১৫ মিনিট দৌড়ানোর পরে গাড়ীটা একটা ফাকা জায়গাতে গিয়ে থেমে যায়। নেলসনও থেমে যায় এবং আমাকেও থামতে বলে। নেমে আসে সেই লোকটি। যাকে আমরা দেখেছিলাম সেদিন রাতে। লোকটা গাড়ী থেকে নেমে একটা মাটির রাস্তা ধরে এগুতে থাকে। যখন অনেক দূরে চলে যায় তখন নেলসন আমাকে নিয়ে এগিয়ে যায় গাড়ীটার কাছে। গাড়ীর সব দরজা লক। তাই নেলসনের কিছুটা রাগ হয়। লোকটার ফিরবার অপেক্ষা করতে থাকে। আমিও ওর সাথে অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্ত লোকটার বদলে চলে আসে একটা পুলিশের গাড়ী। আমাদের কে আটক করে সেই বাড়ীতে নিয়ে যায় যেখানে গতকাল আমরা দুজনে ছিলাম। আমাদের জিজ্ঞাস করলে সত্যিটা বলে দেই...

"আমরা গত কাল এ বাড়ীতেই ছিলাম," তারপর আমাদের ঘাড় ধরে গাড়ীতে তুলে নেয়। আর মাইক্রোবাসটার ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলে আমরা বলি সেটা লাশের গাড়ী। মাইক্রোবাসের কি হয়েছে সেটা আমরা জানিনা। এটাই ছিল আমাদের ঘটনা। কিন্ত বিশ্বাস করেন, আমরা খুনের ব্যাপারে কিছু জানিনা স্যার।"

রেকর্ডিংটা এখানেই শেষ।

এডভোকেট জাফ্রি ইন্সপেক্টর আরিয়ানের দিকে ফিরে মুচকি হাসলেন। যে হাসিতে একটা রহস্য লুকিয়ে ছিল। ইন্সপেক্টর আরিয়ান রহস্য না বুঝলেও সেটার ঘ্রাণ পেয়ে যায়। তাই জিজ্ঞাস করে ফেলে, "কি পেয়েছিস বল এবার!"

এডভোকেট জাফ্রি ঠোটে হাসি রেখেই বলতে শুরু করলেন.... "কথায় নড়চড় আছে দেখছি। অরিত্র রেকর্ডিং এ বলেছে সে রাতে ওই বাড়ীটায় ঘুমিয়েছিল। অথচ সেদিন সাক্ষাৎ এ বলেছিল বাড়ীটা অন্ধকার ছিল। দুজনে অন্ধকারে খাবার খেয়ে চলে আসে। এখানে বিশাল একটা ঘাপলা আছে দোস্ত," ইন্সপেক্টর আরিয়ান মাথা দুলিয়ে সহমত প্রকাশ করলেন।


"আর হুইসেল বাজানোর ব্যাপারটা বুঝলাম না ঠিক," বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"ডাকাত আসে তাই হয়তো সবার ঘরে হুইসেল রেখে দেয়। ডাকাত আক্রমণ করলে অথবা তাদের উপস্থিতি পেলে হুইসেল বাজায়। এছাড়া অন্য কারণ দেখিনা," জবাব দিলেন তার বন্ধু।

"ঠিক বলেছিস, এমনটাই হবে হয়তোবা।" সহমত প্রকাশ করলেন ইন্সপেক্টর।


বাকি পথটুকু গল্পের সাথে কাটিয়ে কুমিল্লা শহরে পা রাখেন দুজন। সময়টা ছিল সন্ধ্যার শুরুর দিকে। গাড়ী চালককে বলে দেয় একটা ভালো রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে রুম বুক করতে। তারপর কি করতে হবে সেটা ফোনে জানানো হবে। গাড়ী চালক এডভোকেট জাফ্রির নির্দেশ অনুযায়ী গাড়ী নিয়ে চলে গেলেন। তারপর দুজনে মিলে ধর্মসাগর পারে চলে যায়।

ওখানে গিয়ে সন্ধ্যাটা কাটিয়ে দেয়। তারপর এডভোকেট জাফ্রির অনুরোধমত বিখ্যাত রসমালাইয়ের দোকানের দিকে এগুনো শুরু করে। এ নিয়ে ঝামেলায় পোহাতে হয়নি, পার্ক থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা চালককে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি রাজি হয়ে যায়।

কিছু সময়ের মধ্যেই দুজনকে পৌছে দেয় রাজগঞ্জ। সেখানেই অবস্থিত কুমিল্লার বিখ্যাত মাতৃভাণ্ডার। যেটার আর কোনো শাখা নেই যদিও অনেকেই এই দোকানটার নাম নিয়ে ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

দোকানটায় সবসময় ভিড় জমে থাকে। প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করে সিরিয়াল পেলেন। রসমালাই নিয়ে ড্রাইভার কে ফোন দিয়ে লোকেশন জানিয়ে দেন। ড্রাইভার এসে দুজনকে সাথে নিয়ে ফিরে যান হোটেলে। দুই বন্ধুর জন্য ডাবল বেডের রুম নেয়া হয়েছে। দুজনে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিতে থাকে। অতঃপর রাতে ডিনার সেরে যে যার মত ঘুমিয়ে পরে।

সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে সবাই। আবারো শুরু হয় যাত্রা । লোকেশন লিখা ছিল তবে জায়গাটা কারও চেনা নেই। রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞাস করে এগিয়ে যায় গাড়ী চালক। প্রায় দেড় ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে সে এলাকাতে কয়েকটা দোকানের সামনে গিয়ে গাড়ী থামে। একজন লোককে জিজ্ঞাসা করার পর বাড়ীর লোকেশন বলে দেয়। দোকান গুলো থেকে আধ কিঃমিঃ সামনে গেলে বাড়ীটা। রাস্তা প্রচণ্ড আঁকাবাঁকা ছিল। তাছাড়া এই রাস্তা ভাঙা এবং চওড়া একদম কম বললেই চলে। তাই অনেক সময় লেগে গেছে। এডভোকেট জাফ্রি গাড়ী থেকে নেমে পরলেন। ওখানে একটা চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দিলেন। তার বন্ধু এসে বসলেন পাশে।

"কি রাস্তারে ভাই, এই টুকু পথ ২০ মিনিটেই শেষ হতো যদি রাস্তা ঠিক থাকতো," একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন এডভোকেট জাফ্রি। ক্লান্ত হয়ে গেছেন সেটা তার মুখের ভঙ্গিতে বুঝলেন তার বন্ধু।

"পাহাড়ি রাস্তা গুলোও এর থেকে ভালো। এই টুকু পথেই বিরক্তি ধরে গেছে। যাকগে, আর বেশী দূরে যেতে হবেনা," কিছুটা বিদ্রুপ করে জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর।

"আচ্ছা দোস্ত ওই বাসার নাম্বারে একটা কল করলে ভালো হয়না? সারা পথ জিজ্ঞেস করে আসলাম। বাড়ীটা খুঁজতে যদি আরও সময় লাগে?" অনুনয় করলেন এডভোকেট জাফ্রি। কথা গুলো শুনে তার বন্ধুর ভ্রু কুঁচকে গেলো ।

"ধুর বেটা! এটা জিজ্ঞাস করলে যদি তাদের মনে প্রশ্ন আসে, কিসের ইনভেস্টিগেশন করবো যেখানে আমরা বাড়ীটাকেই খুঁজে পেলাম না। সাধারণত একটা বাড়ী যদি না পাই আর ক্রিমিনাল? হদফ!!!" কিছুটা উত্তেজিত হয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

তার জবাবে দোকানের বাকি লোকজন ঘুরে তাকালেন দুজনের দিকে। পেছন থেকে একজন জিজ্ঞাস করলেন "আপনারা পুলিশ বুঝি?"

প্রথমে পিছনে তাকালেন তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন ইন্সপেক্টর।

"ওই মেয়ের ব্যাপারে কিছু জানা গেছে?"

জানা গেছে অনেক কিছুই। তবে আসল ক্রিমিনালকে এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। জবাব দিলেন এডভোকেট জাফ্রি। "এই রাস্তা ধরে গেলে প্রথমে একটা বিল্ডিং পরবে। কিন্ত সেটা ওই বাড়ী না। তার থেকে আরেকটু সামনে গেলে একটা রঙিন বাড়ী পাবেন। ওখানেই সব ঘটেছিল ।"

"জ্বী ধন্যবাদ," বিল পরিশোধ করে গাড়ীতে উঠে বসলেন এডভোকেট জাফ্রি। তার পাশে বসলেন ইন্সপেক্টর। গাড়ী এগুনো শুরু করলো ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ীটার দিকে।

"সরি দোস্ত রাগ করিসনা। তুই সহজ জিনিষটা কে পেঁচিয়ে নিচ্ছিলি," কোমল স্বরে বললেন ইন্সপেক্টর।

"আরে মাইন্ড করিনি। কিন্ত এতো মানুষের সামনে এভাবে চেঁচাতে হয়!" জবাব দিলেন তার বন্ধু।

"আসলে এই কেইসটার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি তাই কি রেখে কি করবো বুঝতে পারছিনা। সময় কম কিন্ত অনেক কাজ," বললেন ইন্সপেক্টর।

এডভোকেট জাফ্রি আর কোনো সায় দেয়নি। চুপচাপ গাড়ীতে বসে আছেন। আধ কিলো পথ শেষ হতেই সেই বাড়ীটার সন্ধান পাওয়া গেলো। গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়ালেন তারা দুজন। বাড়ীটা সুন্দর কিন্ত নির্জন।

গেইটে কলিংবেল চাপার পর একজন যুবক বেরিয়ে আসে। পরিচয় পেয়ে তাদের কে ভিতরে নিয়ে যায়। বাড়ীতে ৪জন মাত্র মানুষ থাকতো। এখন ৩ জন থাকে কারণ একজন সদস্য বেঁচে নেই। যিনি মারা গেছেন তিনি এই বাড়ীর বড় বউ। বাকিরা হচ্ছেন তার শশুড়-শাশুড়ি এবং তার একমাত্র দেবর। শশুড়-শাশুড়ী বাড়ীতেই থাকে। দেবর পড়াশুনা করে। আর বড় ভাই প্রবাশী।

সেখানে বেশ কয়েকটা ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ চলে। প্রায় সব ধরনের প্রশ্নই করা হয়েছিল। তবে উত্তর পেয়ে বরাবরের মত হতাশ হলেন এডভোকেট জাফ্রি এবং তার বন্ধু আরিয়ান। পারিবারিক ব্যাপারে যা তথ্য পেলেন তাতে কেও সন্দেহের অন্তর্ভূক্ত নয়। বরং এনারাও দোষারোপ করলেন নেলসন আর অরিত্রকে। দুজনে সিদ্ধান্ত নিলেন ঘরটা একবার ঘুরে দেখার। তালাবদ্ধ ছিল। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী খুলে দেয়া হয়। অভিশপ্ত রুমে ঢুকে চোখ বুলালেন দুজনে। তারপর এদিক সেদিক একটু ঘাটাঘাটি করে। কোনো কিছুর খোঁজ মেলেনি। না পাবারি কথা কারন মেয়েটাকে গলা টিপে খুন করা হয়েছিল।

কিন্ত নেলসন এবং অরিত্রের ফিংগার প্রিন্ট আর আসামির ফিংগার প্রিন্ট ভিন্ন । অর্থাৎ নেলসন এবং অরিত্রের সাথে মেডিকেল রিপোর্ট, ফিংগার প্রিন্ট মিলছেনা। দুই বন্ধুর চেহারা মলিন হয়ে গেছে। কিছু সময় পর আবার জিজ্ঞাসাবাদে বসবেন বলে জানালেন। রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে আসলেন। বাইরে এগিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ালেন...

"তোর মনে হয় এখান থেকে কোনো উপায় বের হবে?" জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান। তবে অভিব্যক্তি অন্য কিছু। কেইসটা নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করছে সেরকম ইংগিত করলেন তিনি।

"আমিও বুঝতেছিনা কিছু। আসামী যদি নেলসন,অরিত্র হয় তাহলে মেডিকেল রিপোর্ট, ফিংগার প্রিন্ট মিলবেনা কেনো! তাছাড়া এতো মার-গুতা হজম করেছে কিন্ত খুন করেছে বলে স্বীকার করেনি একজনও," উদ্বিগ্ন হয়ে জবাব দিলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"প্লানিং করে করেছে। জেনো ধরা পরার রাস্তা না থাকে। তাছাড়া এখন কিছু মেডিসিন পাওয়া যাচ্ছে যেটা ব্যাবহার করলে ফিংগার প্রিন্ট ধরা পরবেনা। যেখানে লাগিয়ে কাজ চালাস কিন্ত ছাপ পরবেনা। ছাপ পরলেও মিলবেনা," আশ্বাস দিলেন ইন্সপেক্টর।

বেশ কিছু সময় দুজনে মিলে আলোচনা করে গেলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েটার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার। কিন্ত সেখানেও তেমন খোঁজ মিলেনি। সন্দেহজনক কেও নেই। আবারো হতাশ হলেন। অতঃপর এখান থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরলেন তারা।

"দোস্ত এলাকাটা ঘুরে দেখলে খারাপ হয়না," বললেন এডভোকেট জাফ্রি। তার কথা শুনে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেছে ইন্সপেক্টরের।

"সিরিয়াসলি? সময় নষ্ট করতে ভালো লাগে তোর?" উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"সময়তো আছেই। লাশের গাড়ীটা যেখানে পাওয়া গেছে সেদিকে যাই চল," জবাব দিলেন তার বন্ধু।

"ওই লোকেশন আমার লিখা নেই। ওখানে আমাদের কোনো কাজও নেই। দেখছিস না বিকেল হয়ে গেছে। আমাদের চলে যাওয়াটা ভালো।তাছাড়া রাতে নাকি ডাকাত আসে এখানে," বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

কিন্ত মানাতে পারেনি তার বন্ধুকে। সে তার সিদ্ধান্তে অটুট। তার ইচ্ছানুযায়ী গাড়ী নিয়ে গ্রামের আরো ভিতরে যেতে থাকলেন।

দুজনেই লক্ষ্য করে দেখলেন গ্রামটা খুব নির্জন। বাড়ীঘর খুব একটা নেই। এখানে প্রতিটা বাড়ীর দূরত্ব প্রায় ২০০মিঃ। যার জন্য ডাকাতরা এই এলাকায় বাসা বেধেছে। আশেপাশের পরিবেশ দেখতে দেখতে গ্রামের অনেক ভিতরে চলে গেলেন। রাস্তাটা ইউ টার্ন হয়ে এসেছে। এগিয়ে গেলে আরো কয়েকটা গ্রাম পাওয়া যাবে। তবে রাস্তাটা আবার শহরে গিয়ে মিলেছে। অবশ্য স্থানীয়রা ছাড়া কেও জানেনা। প্রায় দেড় ঘন্টা সময় ধরে এগুলেন তারা।

কোথাও কিছুর খোঁজ পেলেন না। মাঝে মাঝে শুধু কয়েকটা দোকান দেখা গেছে। এর বেশী কিছু নেই। গাড়ীর গ্যাস তেমন নেই সেটা জানালেন গাড়ী চালক। তাই গাড়ীটা ঘুরিয়ে শহরের দিকে যেতে শুরু করলেন। ভাঙা রাস্তা তাই সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছিলো।

২ঘন্টা পর দেখতে পেলেন সেই বাড়ীটি। যে বাড়ীতে আজ বেশ সময় ধরে ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে ছিলেন তারা। বাড়ীটার সীমানা পেরিয়ে যাবার সময় দুজনেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেইসটার সমাপ্তি হয়তো ঘটতে যাচ্ছে। হয়তো নেলসন এবং অরিত্রের জন্য কঠিন সাজা অপেক্ষা করছে বলে ধারণা করলেন এডভোকেট জাফ্রি।

গাড়ীটা আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তার পাশে একজন লোক দেখতে পেলেন। এই শীতে বয়স্ক লোকটা লুঙি মুড়িয়ে রেখেছেন। সম্ভবত খেজুর গাছে উঠবেন। এডভোকেট জাফ্রি গাড়ীটা থামাতে বললেন। গাছটার একদম সামনে গিয়ে গাড়ী থামলো। গাড়ী থেকে নেমে গেলেন এডভোকেট জাফ্রি। নিচে ছোট একটা হাঁড়ি দেখতে পেলেন। তাতে উঁকি দিচ্ছে খেজুর গাছের তাজা রস।

"আংকেল রস বিক্রি করবেন?" উৎফুল্লিত হয়ে জিজ্ঞাস করলেন। লোকটা তখন গাছ থেকে নামছিলেন। হাতে আরেকটা ছোট হাড়ি।

"বাবা বিক্রি করি। কিন্ত আপনাদের কাছ থেকে টাকা নিবোনা," জবাব দিলেন বয়স্ক লোক।

"কেনো?" কিছুটা বিস্মিত হয়ে গেলেন এডভোকেট জাফ্রি। "টাকা লাগবেনা বাবা। আমার একটা উপকার করে দিও যদি সম্ভব হয়," বয়স্ক লোক অনুরোধ রাখলেন।

"জ্বী বলুন," কিছুটা সংকোচ হয়ে বললেন এডভোকেট।

"আমার একটাই মাত্র মোবাইল ফোন ছিল। কয়েকদিন আগে এখানে হাঁড়ি নামাতে এসেছিলাম রাতে। তখন ৬জন ডাকাত আমার ফোনটা নিয়ে গেলো। এখন আর মোবাইল কেনার টাকা নাই যে নতুন ফোন কিনবো। ফোনটা আর খুঁজে পাওয়া যাবে?" বিস্তারিত বললেন বয়স্কলোক।

কথা বলার সময় কান্নাস্বর চলে আসে তার। বোঝাই যাচ্ছিলো লোকটা খুব কষ্ট পেয়েছে তার এক মাত্র ফোন হারিয়ে। "শারীরিকভাবে ক্ষতি করেনি তাই শুকরিয়া। আচ্ছা, আপনি কিভাবে বুঝলেন আমরা আইনের লোক?" জিজ্ঞেস করলেন এডভোকেট।

"জ্বী আল্লাহর রহমত ছিল তাই ক্ষতি করেনি। ওরা ছেঁচড়া ডাকাত। ক্ষতি করেনা সহজে। ডাকাতি করে চোরের মতো করে। আমাকে বলে গেছে গ্রামে ডাকাত আসে সেটা কাওকে না বলি। কিন্ত গ্রামের সবাই জেনে গেছে এই ছেঁচড়া ডাকাতের কথা। (একটু থেমে গেলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন) আজকে সকালে আপনারা আসার সময় দোকানে বসছিলেন। সেসময় আপনাদের কথা শুনে বুঝেছিলাম।"

কথা শুনে মুচকি হাসলেন এডভোকেট। গাড়ীর ভিতরে বসেই ডাক দিলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"আংকেল এদিকে আসেন" লোকটা এগিয়ে গেলে তার ফোন নাম্বারটা সেভ করে নিলেন। তারপর উপদেশ দিলেন "ফোন হারালে থানায় গিয়ে জানাতে হবে। ফোনের কাগজপত্র সাথে নিয়ে যাবেন। এখন যেতে হবেনা। আমি আপনার ফোনটা ট্র‍্যাক করে দেখবো কোথায় আছে। সে অনুযায়ী কুমিল্লা থানায় রিপোর্ট করে দিবো। যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে ফিরে পাবেন।"

বয়স্কলোক বেশ খুশি হলেন। হাড়ি দুটো এডভোকেট জাফ্রির দিকে এগিয়ে দিলেন... "নিয়ে যান। টাকা লাগবেনা বাবারা।"

কিন্ত এডভোকেট জাফ্রি পাঁচশ টাকার একটা নোট তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন "এটা রসের দাম। আর ফোনটা আপনার হক। আমরা চেষ্টা করবো আপনার ফোনটা বের খুঁজে দেবার।"

গাড়ীতে উঠে বসলেন তিনি। ধীরে ধীরে এগুতে থাকলো শহরের পথ ধরে। ইন্সপেক্টর আরিয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন তার বন্ধু "লোকটার জন্য খুব খারাপ লাগলো। ফোন হারিয়ে বেশ কষ্ট পেয়েছেন। কিন্ত ফোনটা আর পাবে মনে হয়না"

ইন্সপেক্টর তখন হাঁড়িতে উঁকি দিচ্ছেন। তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ। "কিরে দোস্ত হাঁড়ি গুলোয় রস অল্প। তাছাড়া ময়লা ভাসতেছে" এডভোকেট জাফ্রি হুহু করে হেসে দিয়ে বললেন।

"আরে এগুলো পেটে গেলে সমস্যা নাই। অন্তত ঢাকা শহরের ধূলাবালিতো আর না!"

"তাহলে আমি আগে শুরু করি।" তাজা রস পেয়ে লোভ সামলাতে পারলেন না ইন্সপেক্টর। চুমুক দিলেন হাঁড়ি থেকে। ওনাকে দেখে তার বন্ধুও অপর হাঁড়িটা টা ধরে কাত করলেন। চুমুক দিবে ঠিক তখন গাড়ীটার হার্ডব্রেক চেপে দিলেন চালক। "স্যার, সামনে দেখেন," ভীতস্বরে বললেন গাড়ী চালক। দুজনে দৃষ্টি হানলেন সামনের দিকে। ৬জন

লোক দাঁড়িয়ে আছে। পরনে মোটা জ্যাকেট। মুখ রুমালে ঢাকা। হাতে ছুড়ি,চাপাতি ঝুলছে। ইন্সপেক্টর দড়জাটা খুলেই পুরো এক রাউন্ড গুলি শেষ করে দিলেন। চোখের সামনেই ৬টা লাশ পরে গেলো। ফোনটা বের করে কুমিল্লা থানায় ইনফর্ম করে দিলেন। এডভোকেট গাড়ী থেকে বেরিয়ে আসলেন।

"কিরে মেরে দিলি? সমস্যা হবে নাতো!" ইতস্তত করে জিজ্ঞাস করলেন তার বন্ধু। "তোর জন্যই এমন হয়েছে। বারবার বললাম জলদি ফিরে যাই। এখনতো ক্রিমিনালের বদলে ডাকাতের দেখা পেলাম। কি আর হবে, এনকাউন্টার বলে চালিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া তুই তো আছিসই," জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"হ্যা তা ঠিক। অবশ্য খারাপ করিসনি। চান্স দিলে হয়তো আমাদের জখম করে দিতো। কি সাংঘাতিক ব্যাপাররে ভাই! রাত তেমন গভির হয়নি অথচ এরা রাস্তায় নেমে পরেছে," উদ্বেগ সুরে বললেন এডভোকেট। গাড়ীটা সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে থামানো হয়। সেই চায়ের দোকানে যেখানে সকালে বসেছিল। মাত্র ৪-৫জন লোক আছে। সেখানে গিয়ে খবর দেয়ার পর সেখানের লোকজন জলদি ছুটে যায় লাশ গুলোর কাছে। আস্তে আস্তে গ্রামে খবর ছড়িয়ে যায়। গ্রামের মানুষ জড়ো হতে থাকে সেখানে। এতোদিন লুটপাটের স্বীকার হয়েছে। এবার সবাই দেখতে আসছে লুটকারীদের। গ্রাম প্রাণবন্ত হয়ে উঠে আনন্দের আবেশে। ইন্সপেক্টর এবং এডভোকেট জাফ্রির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পুরো গ্রামবাসী। কিছু সময় পরে একটা অম্বুলেন্স চলে আসে। সাথে আরেক গাড়ী পুলিশ। লাশ নিয়ে সবাই একসাথে ফিরতে থাকে শহরের পথ ধরে। কুমিল্লা থানায় পৌছে বেশ কিছু সময় আলোচনার পর রাতের ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে যায় দুই বন্ধু।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফিরতে থাকে ঢাকায়। কাজ এখনো শেষ হয়নি। কেইসটা ইন্সপেক্টর আরিয়ানের হাতে তুলে দিলেন এডভোকেট। কারণ নেলসন এবং অরিত্রকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটাও বৃথা গেছে। প্রমাণ করার মত কোনো ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি। কয়েক দিনের মধ্যে ওদেরকে শেষবারের মত কোর্টে চালান করা হবে। ওখানকার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়া হবে। ইতিমধ্যে খবরটা নেলসন এবং অরিত্রের কানে চলে যায়। দুজনে চেঁচামেচি করে ইদানীং তাই আলাদা সেলে রাখা হয়েছে। হঠাৎ একদিন ইন্সপেক্টর আরিয়ানের স্ত্রী এ ব্যাপারে ডাকাতদের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করে। তখন বিস্তারিত বলার সময় খেজুরের রসের কথাটা শেয়ার হয়।

তার স্ত্রী আফসোস করেন কারণ রসটাও খেতে পারেনি। এদিকে আরিয়ানের মনে পরে বয়স্ক লোকটার। বেচারের ফোনটা খুঁজে দেয়ার অনুরোধ করেছিল। পরেরদিন সকালে তার দেয়া ফোন নাম্বার ট্র‍্যাকিং করালেন তিনি।

সেই সাথে ছাড়া পেয়ে গেলো নেলসন এবং অরিত্র। এডভোকেট জাফ্রি সব ব্যাবস্থা করে তাদের কে ছাড়পত্র দিলেন।

আজকে নেলসন আর অরিত্র একসাথে জেইল থেকে বিদায় নিচ্ছে। বাহিরে পরিবার সদস্যরা অপেক্ষা করছে। জেইলের মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে খেয়াল করলো সেখানে নেলসনের বাবা ছাড়া বাকি সবাই আছেন। লোকটা মুখে যা বলেছিলেন তাই করেছেন। জেল পর্যন্ত আসতে হয়নি তার। বিদায় জানালেন ওদের সহ পরিবার সদস্যদের। অতঃপর ইন্সপেক্টর আরিয়ানের সাথে এগুতে থাকলেন তাদের আড্ডা দেয়ার চায়ের দোকানে। কয়েক কদম ফেলার পর ডাক পরলো পিছন থেকে, "ভাইয়া আমাদের কে কিভাবে ছাড়ালেন সেটা তো জানা হলোনা।"

পিছনে তাকিয়ে দেখে নেলসন এবং অরিত্র দুই বন্ধু। এবার ইন্সপেক্টর এবং এডভোকেট আরিয়ান একটু মুচকি হাসলেন। "আসলে কাজ গুলো এতো জলদি করে ফেললাম যে জানানোর সুযোগটা হলোনা। আমরা দুঃখিত," বললেন ইন্সপেক্টর আরিয়ান।

"তো এখন বলেননা প্লিজ," অনুরোধ করলো অরিত্র।

"শোনো, ওখানে গিয়ে একটা ফোন নাম্বার পাওয়া গেছে। ওখানের ডাকাতরা এই ফোনটা এক বয়স্ক লোকের কাছ থেকে ডাকাতি করে নিয়ে যায়। নাম্বারটা ট্র‍্যাক করার পর লোকেশন পেলাম সেই এলাকার। তারপর আরো কিছু তদন্তের পর ফোনটা পাওয়া গেছে সে বাড়ীটার উঠানের এক কোনে। যে বাড়ীটায় তোমরা ছিলে। আসলে ধর্ষণ এবং মার্ডার হয়েছে ডাকাতের হাতে," রিলাক্স ভাবে কথা গুলো বললেন এডভোকেট জাফ্রি।

"ডাকাতদের পিছনে সময় দিলে আমরা আরো আগেই ছাড়া পেতাম," মন্তব্য করলো নেলসন।

"ঠিক তা না। আসলে বাড়ীটা থেকে শুধু অলংকার ডাকাতি হয়েছে। ওই মেয়ের রুমে থাকা আলমারি থেকে। যেটা আমাদেরকে মেনশন করা হয়নি। আসলে তারা নিজেরাই বুঝতে পেরেছে অনেক দেরিতে। বাড়ীতে একরকম হাহাকার চলছিলো তাই পরিবার সদস্যরা সেটা খেয়াল করেনি।ছেঁচড়া ডাকাত তাই ছোটখাটো চুরি করে চলে যায়। তাছাড়া মেডিকেল রিপোর্ট মিলে গেছে এদের সাথে।এরাই প্রকৃত আসামী। অর্থাৎ সে রাতে বাড়ী থেকে বেরুবার সময় ফোনটা উঠানে পরে গিয়েছিলো," কথা শেষ করতেই আরেকটা প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন এডভোকেট জাফ্রি।

"আর গাড়ী সহ লাশটা?" জানতে চাইলো নেলসন।

"ব্যাটাকে ধরেছি। সে এলাকায় বলে এসেছিলাম কেও যদি কোনো গাড়ী খোঁজ করতে আসে তাহলে তাকে বেধে রাখা হয়। তোমাদের যখন আটক করা হয় তখন শুধু তোমরা আর গাড়ীটা ছিল। লোকটা ছিলনা। তাই আমাদের বিশ্বাস কেও না কেও ওই এলাকায় গাড়ীটার খোঁজ করবে। যদিও অনেক দেরীতে করে ফেলেছে। তবে মজার ব্যাপার লোকটা স্বীকার করেছে তোমরা ওনার সাথের নয়। কিন্ত স্বীকার করছেনা লাশটা কি করেছে। এ কাজে কারা জড়িত আছে? তোমাদের মত পিস। মার খাচ্ছে তবে মুখ খুলছেনা।" বিস্তারিত বললেন এডভোকেট। "আমরা কি ক্রিমিনাল নাকি যে স্বীকার করবো। ধন্যবাদ বিস্তারিত বলার জন্য," বলল নেলসন।

ইন্সপেক্টর আরিয়ান নেলসন এবং অরিত্রের দিকে ভাবুক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন এতোক্ষণ। কিছু একটা বলতে চাইছেন তিনি।

তার অভিব্যক্তিতে প্রশ্ন জড়ালো নেলসন "কিছু বলবেন?"

"আচ্ছা তোমরা গাড়ীটার সাথে কেনো গিয়েছিলে? তোমরা কি জানতে এটা লাশ পাচারের গাড়ী?" জিজ্ঞাস করলেন ইন্সপেক্টর।

"লাশ পাচারের গাড়ী তা এই মাত্র জানলাম। আমরাতো শুধু গিয়েছিলাম লাশটা কি করবে তা দেখার জন্য!"

এডভোকেট এবং ইন্সপেক্টর একসাথে জিজ্ঞাস করলো "মানে?"

"মানে লাশটা একটা হিজরার লাশ ছিল। আমি জাষ্ট জানতে চাইছিলাম একজন হিজরা মারা যাবার পর কি করা হয়। কারণ তারা ধর্ম পালন করে মনে হয়না। লাশটা কবর দিবে নাকি অন্য কিছু করবে সেটার জানার জন্য গিয়েছিলাম। ভূলবশত লাশ পাচারের পাল্লায় পরে গেলাম। যাকগে, ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। কথায় ইতি টেনে পিছনে ফিরে হাটতে শুরু করলো নেলসন। সেই সাথে অরিত্রও চলে গেলো। এদিকে আকাশ ভেঙে পরলো এডভোকেট এবং তার বন্ধু ইন্সপেক্টর আরিয়ানের উপর। হয়তো অন্যরকম উত্তর আশা করেনি।

"দোস্ত তুই এই জন্য গিয়েছিলি?"

"অরিত্র তোর সাথে হয়তো আর চলা হবেনা। তুই আমাকে আবোল-তাবোল তো বলছিস সেই সাথে আমাকে দোষারোপ করলি।"

"দোস্ত মাথা ঠিক ছিলনা।"

"বিপদে বন্ধু চেনা যায়।"

(সমাপ্ত) Ads:

COMMENTS

Name

অন্য বিষয়ের উপর লেখা ইবুক কবিতা গল্প/কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা জীবনের সত্য ঘটনা থ্রিলার গল্প দেশের গল্প পিশাচ কাহিনী ভালোবাসার গল্প ভৌতিক গল্প রম্য গল্প রহস্য গল্প সায়েন্স ফিকশন হরর গল্প
false
ltr
item
Bengali pdf and story blog: দৌড় - শাওন রোহিত || থ্রিলার গল্প
দৌড় - শাওন রোহিত || থ্রিলার গল্প
https://4.bp.blogspot.com/-ymCO6q9WWc4/WnSPkcO7mlI/AAAAAAAAAig/3RbDsgFh4eAcrefICNH2I7_pVB2cwnVdgCLcBGAs/s320/1516623456213.jpg
https://4.bp.blogspot.com/-ymCO6q9WWc4/WnSPkcO7mlI/AAAAAAAAAig/3RbDsgFh4eAcrefICNH2I7_pVB2cwnVdgCLcBGAs/s72-c/1516623456213.jpg
Bengali pdf and story blog
http://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/02/blog-post.html
http://bhootgoyenda.blogspot.com/
http://bhootgoyenda.blogspot.com/
http://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/02/blog-post.html
true
7257552463787474279
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy