পুরানো সেই দিনের স্মৃতি - নুরিয়া জাহান দিয়া || দেশের গল্প

দাদী চলো না গল্প কইবা।(সিঁথি) আইজ আর না দিদি ভাই কাইল শুনামুনে গল্প। আইজ অনেক রাইত হই গেছে গ্যা।অনেক দূর থাইকা আইছো না তোমরা। ক্লান্ত ত...


দাদী চলো না গল্প কইবা।(সিঁথি)

আইজ আর না দিদি ভাই কাইল শুনামুনে গল্প। আইজ অনেক রাইত হই গেছে গ্যা।অনেক দূর থাইকা আইছো না তোমরা। ক্লান্ত তো তুমি।এহন ঘুমাই পরো।(সিঁথির দাদী)

না আমি ক্লান্ত না দাদী আমি গল্প শুনবো। আমি তো ঢাকা থেকে আব্বুর সাথে এসছি তোমার থেকে গল্প শুনবো বলে।আমরা তো কালকেই বিকেলে চলে যাবো। তাই তুমি এখনি গল্প বলবা ওকে দাদী। (সিঁথি)
( নাতনীর জেদের কাছে হার মেনে গল্প শুনাতে রাজি হলো আলেয়া বেগম)

হিহিহি পাক্কা বুড়ি হইছে একখানা। আইচ্ছা শুনামু। এহন কও দেখি কি গল্প শুনবা দিদি ভাই রাক্ষস খুক্ষস,বাঘ বরকি নাকি রাজা রানীর গল্প।(সিঁথির দাদী)

না না আমি এসব গল্প শুনবো না দাদী। (সিঁথি)

ওমা কি কয় এই গুলা শুনবানা তাইলে কি গল্প শুনবা টুনাটুনির কেচ্ছা। (সিঁথির দাদী)

না দাদী আজ তুমি আমাকে যুদ্ধের গল্প শুনাবা।আব্বু বলেছে তুমি নাকি যুদ্ধের গল্প জানো।যে গুলা আমি বইয়ে পরেছি।আজ সেই গুলা তুমি শুনাবে। (সিঁথি)

ওওও তুমি তাইলে যুুদ্দুর(যুদ্ধ) কাহিনি শুনবা।(সিঁথির দাদী)
>উম দাদী যুদ্দু না বলো যুদ্ধ (সিঁথি)
>হাহাহা আমার অতো মুখে আসে না দিদি ভাই।ঐ একি হইলো আর কি।আচ্ছা এবার বলো কি কি শুনবা তুমি। (সিঁথির দাদী)
>যুদ্ধের সময় তোমার বয়স কত ছিল।তুমি কি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দেখেছিলে।তারা কি করে মানুষ মারতো।দাদু কি করে মারা গিয়েছিল যুদ্ধে গিয়ে?? (সিঁথি)
>আচ্ছা তাইলে শুনো। তুমি শুধু চুপ কইরা শুইনা যাও।

যুদ্ধের সময় আমাগো গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ,মাচায় লাউ,কুমড়া, গোয়াল ভরা গরু ছিল।আমি তখন নতুন বউ।গায়ে বিয়ার গন্ধ যায় নাই। কেবল ১ মাস হইছিল বিয়ার।

তখন মাঝ উঠানে বইসা সবাই রেডিওতে খবর শুনতাম। একদিন তোমার দাদা বাজার থাইকা আইসা কইলো শহরে নাকি গুলাগুলি (যুদ্ধ)লাগছে।পাকিস্তানি মিলিটারি আইসা ঘর বাড়ি জ্বালায় দিতাছে।মানুষ কে গুলি কইরা মারতাছে।আমি তো শুনে ভয়ে কেঁদে ফেললাম।তারা নাকি গ্রামের দিকে আসতাছে আস্তে আস্তে।তোমার দাদার ৪ টা ভাই ছিল বড় আর উনি হইলো গিয়া ছোট।

আমি যুদ্ধর কিছু বুঝিনাই তাই তোমার দাদারে আড়ালে ডাইকা জিগাইলাম দেশে কিসের যুদ্ধ লাগছে।তিনি আমারে কইলো ভয় পাইও না আলেয়া বিবি। পাকিস্তানি মিলিটারি আসছে দেশে আমাদের মাতৃভাষা তারা কাইরা নিবার চায়।তারা চায় আমরা বাংলা ভাষা ছাইড়া উর্দু ভাষায় কথা কয়।কিন্তু এটা আমরা হইতে দিমু না। বাংলা মায়ের হাজারো দামাল ছেলে থাকতে কেউ পারবে না আমাগো মায়ের ভাষা কাইড়া নিতে।

তার পরের দিন ঘুম থাইকা উইঠা আমি চুলায় ভাত চরায় দিলাম।তখনি তোমার বড় দাদা দৌড়াইতে দৌড়াইতে আইসা কইলো তোমার দাদারে পালা কলিমউদ্দিন পালা ছোট বউরে নিয়া পালা। মিলিটারি আই পরছে গ্রামে । বাজারে আগুন জ্বালায় দিতাছে।ঘরের বউ ঝি দের উঠাই লই যায়তেছে।

কথাটা শুইনা আমার হাত পা কাপাঁ শুরু কইরা দিলো। চুলার ভাত চুলাতেই থাকলো। চুলার আগুনে পানি দিয়া তোমার দাদা আমারে নিয়া বাড়ির উঠানে আইসা থমকাইয়া খাড়াইলো।পাশের বাড়ি মিলিটারি ঢুইকা মানুষ মারতাছে।কোনো দিশা না পাইয়া তোমার দাদা আমারে লই বাড়ির পিছনে একটা ঝাঁকড়া লিচুর গাছের ডালের ভিতরে লুকাই পরলো।আমি যাতে কথা না বলি সেই লাইগা আমার মুখ চাইপা রাখছিল তোমার দাদা।বাড়ির ভিতরে থাইকা ২ টা গুলির আওয়াজ পাইলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম না কারে গুলি করছে।একটা গুলির পর কুকুর খুব ডাকাডাকি করতাছিল।তার পর ২য় গুলির পর আর ডাকে নাই।মিলিটারি গো চলে যাওয়ার আওয়াজ পাইলাম।

তারপর চুপিচুপি বাড়ির ভিতরে গেলাম দেখি উঠানে আমাগো পালা কুত্তা লালু পইরা আছে। পেটে গুলি করছে রক্ত ঝরছে। দৌড়ায় ঘরের ভিতরে গেলাম দেখি মেজো মিয়ারে (সিঁথির মেজো দাদা)গুলি করছে।আমি চিৎকার দিয়া কাইন্দা উঠি। তখনি পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল.. আপ কাহা ছুপাওগি হিহিহি..জঘন্য ভাবে হাসছিল লোকটা।সেই প্রথম দেখেছিলুম মিলিটারি। আমি ভয়ে তোমার দাদার পিছনে লুকিয়ে পরলাম।লোকটা দেখতে অনেক লম্বা ছিল গায়ে আর্মিদের মত পোশাক ছিল। হাতে একটা বন্দুক ছিল আর সেটা আমাদের দিকে তাক করে রেখেছিল।একটু পরে আরও কয়েক জন চলে আসলো মিলিটারি তারা তোমার দাদাকে জোর করে নিয়ে চলে গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে আড় চোখে হাসছিল।তারপর সবাই চলে গেলো। আমি ভয়ে জ্ঞান হারায়।

জ্ঞান ফিরে দেখি পাশে বাড়ির সবাই বসে কাঁদছে। তারা নাকি ধানের গোলার মধ্যে লুকাই ছিল।মেজো মিয়ার কোনো রকম দাফন করে আমরা বাড়িতে ফিরতাছিলাম। তখনি দেখি আবার আইছে ঐ শয়তান গুলা।মনে মনে ভাবলুম হয়তো আমার জন্যই আইছে।কারণ তখন তাদের কুনজর পরেছিল আমার উপরে।৩ দিন ৩ রাত লুকায় লুকায় কাটাইলুম।এর মধ্যে কোনো খবর নাই তোমার দাদার।ধরে নিছি তারে মাইরা ফালাইছে।আইজকার এই রাইতে মানে সেদিন ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি। সবাই এক ঘরে ঘাপটি মেরে বইসা আছি তখনি কেউ এসে দরজায় টুকা দিলো। সবার মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো। ছোট ছোট বাচ্চারা বুইঝা গেছিলো পালাইতে হইবো তাই ছুটে গিয়ে ধানের গোলার মধ্যে লুকাই গেলো। আমি ভয়ে বড় বউয়ের পিছে দাঁড়াইলাম।আবারও টুকা পরলো দরজার।বড় মিয়া এইবার কথা কইলো। কেডা টুকা মারে দরজায় কেডা।কথা কয় না ক্যা।

ওপাশ থেকে একটা গলা ভেসে আইলো।বড় মিয়া আমি আমি কলিমউদ্দিন দরজা খুলেন।
তখন যেন সবার ধরে প্রাণ ফিরলো।বাচ্চাকাচ্চারা গোলা থাইকা বাইরে আইলো।বড় মিয়া দৌড়ায় গিয়া দরজা খুইলা দিলো। বড় মিয়া হেরে জোড়ায় ধইরা কাঁদছিল আর কইলো,, তুই বাইচা আছিস ছোট মিয়া।আমরা তো ভাবছি ওরা তোরে মারাইরা ফ্যালাইছে।

কাইন্দো না বড় মিয়া।আমারে মারতে পারে নাই। আমার মতো ২০ জন যুবক ছেলেকে ধইরা নিয়া গেছিলো। তারপর মজুর পুকুরপাড়ে এক লাইনে দাড় কইরা একটা একটা কইরা গুলি করতাছিল। আর গুলি লাইগা লাশ গুলা মজুর পুকুরে পইরা যায়তাছিল।আমারে যখন গুলি করছিল তখন হেইডা বুকে না লাইগা পায়ে লাগছে আমি পইরা যায়নি। তহন ওরা আরেকখান গুলি ছুড়ছিল তহনি।আমি ইচ্ছা কইরা পানিতে ঝাপ দিয়া ভাইসা ছিলাম।ওরা চলে যাবার পর পালাই আইছি। তোমার দাদার পা থাইকা অনেক রক্ত ঝরছিল।সেইটা দেইখা আমি আবার জ্ঞান হারায়।জ্ঞান ফিরা দেখি সকাল হইয়া গেছে।পাশে তোমার দাদা পায়ে কাপড় বাইধা বইয়া রইছে।মুখের দিকে তাকায় দেখি সে হাসতাছে। গ্রামের কবিরাজ আইসা তার পা বাইন্দা দিছে আর আমারে দেইখা কইছে আমি নাকি মা হমু। সেদিন উঠানের পাশ দিয়া মিছিল যাচ্ছিল

বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা অমর হক অমর হক,জয় বাংলা

তার ঠিক এক মাস পর দেশ স্বাধীন হইলো। ২৬ মার্চ। পরাজিত হলো পাকসেনারা।

>দাদী আব্বু যে বলেছিল দাদা নাকি যুদ্ধের সময় মারা গেছে।(সিঁথি)
>যুদ্ধের সময় না তয় দেশ স্বাধীন হওয়ার ২ দিন পর মইরা গেছে তোমার দাদা।পায়ে যেহানে গুলি লাগছিল সেইহানে পচন ধরছিল।তহন তো আর এতো ডাক্তার কবিরাজ আছিল না।সবাই যার যার জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল।চিকিৎসার অভাবে পায়ে পচন ধইরা ২৮ মার্চ মইরা গেছে তোর দাদা।
আলেয়া বেগম কথা শেষ করে তাকিয়ে দেখে সিঁথি ঘুমে চোখ বুজে ফেলছে।উনি আর কিছু না বলে সিঁথির কপালে একটা চুমু একে দিলো। গায়ে কাথাঁ টেনে দিয়ে মনে মনে ভাবলো ১৯৭১ সালে তো যুদ্ধের একটা শেষ সময় ছিল।কিন্তু স্বাধীন দেশে সারা বছর যে যুদ্ধ চলছে সেটার শেষ সময় কবে হবে সেটা শুধু আল্লাহ জানে।
স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি কঠিন।

(সমাপ্ত)
ভিজিটর আমাদের ব্লগে খুঁজে থাকে

দেশের গল্প

bangla golpo

ভালোবাসার গল্প

রোমান্টিক গল্প

প্রেমের কাহীনি

ভালবাসার গল্প

বাংলা গল্প

হরর ও ভৌতিক

ভালোবাসার কবিতা

ইবুক

বাংলা ইবুক
Ads: :

COMMENTS

Name

অন্য বিষয়ের উপর লেখা ইবুক কবিতা গল্প/কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা জীবনের সত্য ঘটনা থ্রিলার গল্প দেশের গল্প পিশাচ কাহিনী ভালোবাসার গল্প ভৌতিক গল্প রম্য গল্প রহস্য গল্প সায়েন্স ফিকশন হরর গল্প
false
ltr
item
Bengali pdf and story blog: পুরানো সেই দিনের স্মৃতি - নুরিয়া জাহান দিয়া || দেশের গল্প
পুরানো সেই দিনের স্মৃতি - নুরিয়া জাহান দিয়া || দেশের গল্প
https://1.bp.blogspot.com/-9-vZCJ1-ZSk/WnoET52EbLI/AAAAAAAAAkM/spKH1ojocI4JNEhtAaGKagdqOXqWwZM8gCLcBGAs/s320/1517945182340.jpg
https://1.bp.blogspot.com/-9-vZCJ1-ZSk/WnoET52EbLI/AAAAAAAAAkM/spKH1ojocI4JNEhtAaGKagdqOXqWwZM8gCLcBGAs/s72-c/1517945182340.jpg
Bengali pdf and story blog
http://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/02/blog-post_6.html
http://bhootgoyenda.blogspot.com/
http://bhootgoyenda.blogspot.com/
http://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/02/blog-post_6.html
true
7257552463787474279
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy