অমর একুশে - মাহিরা তাবাস্সুম || দেশের গল্প

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লেখা গল্প অমর একুশে

রেহেনা বেগম তার ছেলে শুভ্রকে কয়েকবার ডাকলেন কিন্তু শুভ্রোর ঘর থেকে কোনো সাড়া পেলেন না।হাতের কাজ ফেলে রেখে চিন্তিত মুখে শুভ্রোর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

ওদিকে শুভ্র কানে হেডফোন লাগিয়ে ফুল সাউন্ড দিয়ে একের পর এক হিন্দি আর ইংলিশ গান শুনেই যাচ্ছে। এই দেখে রেহেনা বেগম আজ প্রচণ্ড রেগে গেলেন। এমনিতে রেহেনা বেগম খুব ঠাণ্ডা স্বভাবের মানুষ।

কাল ২১ শে ফেব্রুয়ারি। প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে তিনি কিছু গরীব,অসহায় মানুষদের গোশত-ভাত খাওয়ান এবং রেহেনা বেগমের শ্বশুড়সহ সকল শহীদদের স্মরণে ছোট খাটো একটা দোয়ার মাহফিল করেন। শাশুড়ি যতদিন সুস্থ ছিল এই কাজটা উনিই করতেন। শুভ্রোর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে শাশুড়ি খুব অসুস্থ হয়ে গেছেন আর সেই সাথে অবাধ্য হয়ে গেছে শুভ্র।

বিকালে বাজারের জিনিসপত্র সব তিনি নিজে কিনে এনেছেন। এখন সব মেলাতে গিয়ে দেখেন যে তেলটাই কেনা হয়নি। শুভ্রকে তেল আনতে পাঠাবেন বলে সেই কখন থেকে ডাকছেন তিনি। শুভ্রোর ঘরে গিয়ে রেহেনা বেগম শুভ্রোর কান থেকে হেডফোনটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন। শুভ্র চিৎকার করে বললো,
“মা এটা কি করলে তুমি? আমার হেডফোনটা ভেঙ্গে ফেললে? জানো তুমি কি দারুণ দারুণ হিন্দি গান শুনছিলাম? কাল ২১ শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পার্টি আছে।

রেহেনা বেগম বললেন "কাল রান্নার জন্য তেলটা মোড়ের দোকান থেকে নিয়ে আয় তো।“

শুভ্র আরো জোরে চিৎকার করে বললো, "কাল পার্টির জন্য গান সিলেক্ট করছিলাম আর এখন তা বাদ দিয়ে গরীব মূর্খদের রান্নার তেল আনবো আমি? অসম্ভব।

“রেহেনা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। জোরে ছেলের গালে একটা চড় মারলেন। ওর হাত ধরে টানতে টানতে রেহেনা বেগমের শাশুড়ি মানে শুভ্রোর দাদীর ঘরে আনলেন। বৃদ্ধার পাশে রাখা শুভ্রোর দাদার ছবিটার সামনে দাড়িয়ে বললেন,

“এই রকম হাজার হাজার মানুষ বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রাঙিয়েছিল কি তোর হিন্দি গান শুনতে? তোর দাদীর মতো শত শত মেয়ে স্বামী হারিয়েছিল কি ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে অসম্মান করতে? তুই আমার ছেলে একথা ভাবতে আমার ঘৃণা লাগছে”—বলে রেহেনা বেগম ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

শুভ্রোর কানে মায়ের বলা কথাগুলো বার বার বাজতে লাগলো। শুভ্র ধীরে ধীরে ওর দাদীর পাশে গিয়ে বসলো।দাদী বার্ধ্যকোর ফ্যাসফ্যাসে গলায় জানতে চাইলো,

কি হয়েছে দাদুভাই?মা এত রেগে গেল কেনো?

(শুভ্র দাদীর হাতটা ধরে বললো) দাদী,আমাকে ভাষা শহীদদের কাহিনী,আমার দাদার শহীদ হবার কাহিনী শোনাবে?

বৃদ্ধার মুখটা মলিন হয়ে গেল।সে যে এক ভয়ংকর শিহরে উঠা কাহিনী যা মনে করলে দুচোখে জল কোনো বাধা মানে না।শুভ্র আবার বায়না ধরলো,”ও দাদী শোনাবে না?”

বৃদ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলেন,”সালটা ছিল ১৯৪৮,তারিখটা সম্ভবত ২১ শে মার্চ,তোর দাদু তখন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।উনি বাসায় ফিরলে দেখি মুখটা থমথমে হয়ে আছে।জানতে চাইলাম কি হয়েছে।বলল,

“আমরা কি মানুষ না?কেন শুধু শুধু ওরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেবে?জীবন দেবো তবুও মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষা করেই ছাড়বো।”জানতে চাইলাম,

“কেন কি হয়েছে?”তোর দাদু বললো,

“এখন আরবি হরফে বাংলা ভাষা লিখতে হবে এই ঘোষণা দেছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।আমরা ছাত্ররা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।”

এই ঘটনার পর কত যে মিছিল,মিটিং,সমাবেশ হলো তার হিসাব নাই।কিছুদিন পর ১৯৫২ সাল আসলো।২০ ফেব্রুয়ারি তোর দাদা আমাকে এসে বললো,

“বউ,মিছিলে যাবো।দরকার হলে জীবন দেবো তবুও বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করেই ছাড়বো কাল।দোয়া করো"।

সেদিন রাতেই উনি চলে গেলেন।পরের দিন খুব অস্থিরতায় দিন গেল আমার।লোকমুখে খবর পেলাম ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অপরাধে পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে।এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি বর্ষণ করলে অনেক মানুষ মারা গেছে।আহত হয়েছে আরো অনেকে।খুব চিন্তিত ছিলাম।বার বার আল্লাহকে ডাকছিলাম।বিকালের দিকে কিছু মানুষ তোর দাদার প্রাণহীন দেহটা বাড়িতে দিয়ে গেল।জমে গেলাম আমি তোর দাদার রক্তাত্ব লাশটা দেখে।ছয় বছরের ছেলে নিয়ে কোথায় যাবো,কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।বুকে পাথর বেঁধে তোর বাপকে নিয়ে নতুন করে জীবন সংগ্রামে নামলাম।যখন সেই সংগ্রামের কথা মনে পড়ে,একা একা ভাবি আমার মতো আরো কত মেয়ের স্বামী শহীদ হয়েছে। কত মা না জানি কলিজার টুকরো সন্তান হারিয়েছে,কত সন্তান হারিয়েছে তার বাপকে। এসব কথা ভাবলে বুকটা ছটফট করে।আসলে কি জানিস দাদুভাই যার চলে যায় সেই বোঝে বিচ্ছেদের কি যে কঠিন যন্ত্রণা।
শুভ্র একমন দিয়ে দাদীর কথা শুনছিল আর দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।নিজের ভুল বুঝতে পেরে আজ শুভ্র লজ্জিত। পরদিন খুব ভোরে একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া ফুল নিয়ে শুভ্র খালি পায়ে শহীদ মিনারে গেল।ঘাসের বিন্দু বিন্দু শিশির কণা শুভ্রোর পা ভিজিয়ে দিচ্ছে।ধীরে ধীরে শহীদ মিনারের উপর উঠে লাল বৃত্তটা জড়িয়ে ধরলো শুভ্র।এতটা পরম শান্তি আর কোনো দিন পায়নি ও।চারিদিকে তাকিয়ে দেখে কত লোক যে ফুল দিয়ে সম্মান জানাতে এসেছে।কিছু পোলাপান আবার সেলফি তুলছে নানান ভঙ্গিতে। কেউ আবার সেজে এসে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মগ্ন। শুভ্র ভাবে,কাল মা আর দাদীমা দুজনে ভুল না ভেঙ্গে দিলে আজ শুভ্র নিজেও এদের একজন হতো। এই প্রথম শুভ্রোর অহংকার হয় কারণ ওর দাদা একজন ভাষা শহীদ,ও আজ বাংলায় কথা বলতে পারছে,একজন বাঙালি।মনে মনে শুভ্র বলতে লাগলো,”হাজার সালাম বাংলার শ্রেষ্ঠ সূর্য সন্তান।আপনাদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা যাদের সমস্ত বিশ্ব স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধার সাথে।“

ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো শুভ্র।দুপুরে অসহায় গরীবদের খাওয়ানো তারপর দোয়া মাহফিল হবে।এখনো যে ওর অনেক কাজ বাকি আছে। কিছুদূর এসে আবার পিছু ফিরে শহীদ মিনারটা দেখলো।সকালের সোনা রোদে কি দারুণ চক চক করছে শহীদ মিনারটা।মনে হলো লাল বৃত্তটা বুঝি শুভ্রকে দেখে মিটিমিটি হাসছে।

সমাপ্ত
ভিজিটর আমাদের ব্লগে খুঁজে থাকে

দেশের গল্প

বাংলাদেশের গল্প

ভালোবাসার গল্প

রোমান্টিক গল্প

প্রেমের কাহীনি

ভালবাসার গল্প

বাংলা গল্প

হরর ও ভৌতিক

ভালোবাসার কবিতা

ইবুক

বাংলা ইবুক

COMMENTS

BLOGGER: 1
Loading...
নাম

অন্য বিষয়ের উপর লেখা ইবুক কবিতা গল্প/কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা জীবনের সত্য ঘটনা থ্রিলার গল্প দেশের গল্প পিশাচ কাহিনী ভালোবাসার গল্প ভৌতিক গল্প রম্য গল্প রহস্য গল্প সায়েন্স ফিকশন হরর গল্প
false
ltr
item
Bangla PDF & Bangla Story: অমর একুশে - মাহিরা তাবাস্সুম || দেশের গল্প
অমর একুশে - মাহিরা তাবাস্সুম || দেশের গল্প
একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লেখা গল্প অমর একুশে
https://3.bp.blogspot.com/-a0MCNvPnCCI/WpjTQRaj-kI/AAAAAAAAAoE/NU1_8oAKflIVHHx-GADykmNjiuCNPAKFACLcBGAs/s320/1519964788045.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-a0MCNvPnCCI/WpjTQRaj-kI/AAAAAAAAAoE/NU1_8oAKflIVHHx-GADykmNjiuCNPAKFACLcBGAs/s72-c/1519964788045.jpg
Bangla PDF & Bangla Story
https://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/03/blog-post_1.html
https://bhootgoyenda.blogspot.com/
https://bhootgoyenda.blogspot.com/
https://bhootgoyenda.blogspot.com/2018/03/blog-post_1.html
true
7257552463787474279
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy